মহারাষ্ট্রে বৃষ্টির দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত
টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টিতে মহারাষ্ট্রের একাধিক জেলা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মুম্বই ও পুণে-সহ পশ্চিম মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। প্রবল বর্ষণ, ভূমিধস এবং জলাবদ্ধতার কারণে পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতির অবনতির জেরে প্রশাসন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর মুম্বইয়ের জন্য কমলা সতর্কতা এবং পুণের জন্য লাল সতর্কতা জারি করেছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টির তীব্রতা অব্যাহত থাকলে আরও নতুন এলাকায় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
মুম্বই-পুণে সড়কে ধস, বন্ধ যান চলাচল
সোমবার ভোরে মুম্বই-পুণে এক্সপ্রেসওয়ের দ্বিতীয় টানেলের প্রস্থানপথে ভূমিধস নামায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধসের কারণে রাস্তার একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের যানবাহন বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, মুম্বই-পুণের পুরনো জাতীয় সড়কের একাধিক অংশে বৃষ্টির জল জমে যাওয়ায় সেখানেও যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিশেষ করে মাভাল ও তামহিনি ঘাট এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে গাছ উপড়ে পড়ায় বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
মহারাষ্ট্র স্টেট রোড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এমএসআরডিসি) জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সোমবার ভোর ৪টা থেকে মুম্বই-পুণে এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে এই পথে যাতায়াত না করার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।
রেল পরিষেবায় বড়সড় প্রভাব
প্রবল বর্ষণের ধাক্কা লেগেছে রেল পরিষেবাতেও। সেন্ট্রাল রেলের কারজাত-লোনাভলা ভোরঘাট সেকশনে একাধিক জায়গায় ভূমিধস নামার ফলে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঠাকুরওয়াড়ি, খান্ডালা এবং মাঙ্কি হিলের মধ্যবর্তী অংশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রেল সূত্রে জানা গেছে।
এর জেরে অন্তত ১৬টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া ট্রেনগুলির মধ্যে রয়েছে ডেকান কুইন, ডেকান এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস এবং প্রগতি এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা। এছাড়া অন্তত ন'টি ট্রেনকে বিকল্প রুটে চালানো হচ্ছে, যার ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে হচ্ছে।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধস সরিয়ে লাইন মেরামতির কাজ চলছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে পরিষেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
লোহাগড় দুর্গের কাছে ধস, উদ্ধার অভিযানে এনডিআরএফ
পুণে জেলার লোহাগড় দুর্গ সংলগ্ন এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একই পরিবারের অন্তত তিনজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন।
ঘটনাস্থলে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। ভারী বৃষ্টি এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, পুণের সদাশিব পেঠ এলাকার একটি তিনতলা ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মুম্বইয়ে বাড়ি ভেঙে মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০
রবিবার গভীর রাতে মুম্বইয়ের মানখুর্দ এলাকায় একটি বাড়ি ধসে পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে পাঁচ শিশু-সহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়। মৃত শিশুদের বয়স দুই থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
এছাড়া গত কয়েক দিনের বৃষ্টি-জনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মহারাষ্ট্রে বর্ষা-দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের।
প্রশাসনের সতর্কতা
ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা বজায় থাকায় প্রশাসন সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকা, নদী সংলগ্ন অঞ্চল এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় এনডিআরএফ, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জলমগ্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ জোরদার করা হয়েছে।



