১০ নভেম্বর আমেরিকায় প্রকাশের কথা সোনিয়ার বই
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লভ’ প্রকাশের খবর সামনে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বইটি আগামী ১০ নভেম্বর আমেরিকার বাজারে আসার কথা। মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ. নফ বইটি প্রকাশ করবে বলে জানা গিয়েছে।
বইটিতে সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবন, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক, বিয়ে, নেহরু-গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশের নানা অধ্যায় উঠে আসতে পারে। ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্তের নেপথ্যের ঘটনাও স্মৃতিকথায় জায়গা পেয়েছে বলে প্রকাশনা সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
তবে আমেরিকায় বই প্রকাশের বিষয়টি যতটা স্পষ্ট, ভারতে সেটির প্রকাশনা নিয়ে পরিস্থিতি ততটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
পেঙ্গুইন কী বলছে?
ভারতে বইটি প্রকাশের সঙ্গে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের নাম জড়িয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার সংস্থার তরফে একটি বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, তারা সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার প্রকাশক নয়।
তবে একইসঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা জানিয়েছে, বইটি প্রকাশ নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল এবং সেই বিষয়ে লেখকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে লেখককে কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ পেঙ্গুইন শুরু থেকেই বইটির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না—বিষয়টি এমন নয়। বরং প্রকাশনা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি বইটি প্রকাশ করছে না।
এই অবস্থান থেকেই বইটির ভারতে প্রকাশনা নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তথ্যের অসঙ্গতি নিয়ে কি আপত্তি?
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাণ্ডুলিপির কয়েকটি জায়গায় তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে পেঙ্গুইনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলি সংশোধন বা পরিবর্তনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, লেখক সেই পরিবর্তনে সম্মত না হওয়ায় প্রকাশক ও লেখকের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত পেঙ্গুইন বইটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে এই দাবিকে এখনও পেঙ্গুইনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সংস্থার বিবৃতিতে ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
পেঙ্গুইনের বক্তব্যের মূল বিষয় হল, লেখকের দেওয়া তথ্য যাচাই করা প্রকাশকের সম্পাদকীয় দায়িত্বের অংশ। কিন্তু লেখকের সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনা হবে না।
ফলে পাণ্ডুলিপির ঠিক কোন তথ্য নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, কিংবা কী ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বইয়ে কোন কোন বিষয় থাকতে পারে?
সোনিয়ার স্মৃতিকথা ঘিরে আগ্রহের অন্যতম কারণ বইটির সম্ভাব্য বিষয়বস্তু। প্রকাশনা সূত্রে জানা যাচ্ছে, লন্ডনের কেমব্রিজে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় থেকে শুরু করে প্রেম ও বিয়ের সময়কার অভিজ্ঞতা বইটিতে উঠে আসতে পারে।
এছাড়াও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, নেহরু-গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজের রাজনীতিতে প্রবেশের ঘটনাগুলিও স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ২০০৪ সালের ঘটনাও বিশেষ আগ্রহের বিষয়। ওই বছর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। কেন তিনি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনাও বইয়ে বিস্তারিত থাকতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
ভারতে কি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হবে?
পেঙ্গুইন সরে দাঁড়ানোর খবর সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি ভারতে সোনিয়ার স্মৃতিকথা প্রকাশিত হবে না?
বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, পেঙ্গুইন বইটি প্রকাশ না করলেও অন্য কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই তালিকায় হার্পার কলিন্সের নামও উঠে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত ভারতে বইটির নতুন প্রকাশকের বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা সামনে আসেনি।
ফলে ভারতীয় পাঠকদের হাতে বইটি কবে পৌঁছবে, কোন প্রকাশকের মাধ্যমে পৌঁছবে এবং আমেরিকায় প্রকাশের সময়ের সঙ্গে ভারতের প্রকাশনার কোনও ব্যবধান থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
প্রকাশনা সংস্থার জন্য ফ্যাক্ট-চেকিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বইটির প্রকাশনা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি। কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতিকথায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ থাকলে সেগুলির তথ্যগত নির্ভুলতা প্রকাশকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে নেহরু-গান্ধী পরিবারের মতো ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই আরও সংবেদনশীল বিষয় হতে পারে।
তবে পেঙ্গুইনের বিবৃতি থেকে এটুকুই স্পষ্ট যে, লেখকের দেওয়া তথ্য ফ্যাক্ট-চেক করা প্রকাশকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোন নির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তা সংস্থা প্রকাশ করেনি।
রাজনৈতিক মহলে কেন বাড়ছে আগ্রহ?
সোনিয়া গান্ধীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে বইটি প্রকাশের আগেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্মৃতিকথা সাধারণত কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ্য অবস্থানের বাইরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তের নেপথ্যের দিক তুলে ধরার সুযোগ দেয়। ফলে সোনিয়ার বইয়ে এমন কোনও তথ্য বা অভিজ্ঞতা প্রকাশ পায় কি না, যা আগে জনসমক্ষে আসেনি, সেদিকেও নজর থাকবে।
বিশেষ করে রাজীব গান্ধী ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এবং ২০০৪ সালের প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্য বইটির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।
এখন নজর নতুন প্রকাশকের দিকে
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতে বইটির প্রকাশনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কোন সংস্থা নেয়। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস স্পষ্ট করেছে যে তারা বইটির প্রকাশক নয়। অন্যদিকে কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার আগ্রহের কথা সূত্রের মাধ্যমে সামনে এসেছে।
তাই পেঙ্গুইনের সরে দাঁড়ানো মানেই ভারতে বইটি প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলা যায় না। বরং প্রকাশক বদলের সম্ভাবনাই এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে।
তবে নতুন প্রকাশকের নাম, প্রকাশের তারিখ এবং পাণ্ডুলিপিতে কোনও পরিবর্তন আনা হবে কি না—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, সোনিয়া গান্ধীর ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লভ’ নিয়ে আগ্রহ এখন শুধু বইটির বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রকাশক পরিবর্তনের জল্পনা এবং পাণ্ডুলিপির তথ্য যাচাই ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ১০ নভেম্বর আমেরিকায় বইটি প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও ভারতে তার ভবিষ্যৎ প্রকাশনা নিয়ে এখন নজর নতুন কোনও প্রকাশনা সংস্থার ঘোষণার দিকে।



