Home/India/ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের জেরেই বিপর্যয়? নেপালের হড়পা বানের নেপথ্যে কী
Advertisement
#16
Advertisement
#17
Advertisement
#18
Advertisement
#19
Advertisement
#20

ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের জেরেই বিপর্যয়? নেপালের হড়পা বানের নেপথ্যে কী

উত্তর নেপালের রসুয়া জেলায় আচমকা হড়পা বানে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। অথচ বিপর্যয়ের আগে নেপালের ওই অঞ্চলে মেঘভাঙা বৃষ্টির স্পষ্ট খবর ছিল না। তাহলে এত বিপুল জলরাশি এল কোথা থেকে? প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তুষারধস, নদীর গতিপথে অস্থায়ী বাধা এবং সেই বাধা ভেঙে জল নেমে আসার সম্ভাবনার কথাই উঠে আসছে। একই সময়ে তিব্বত অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টি এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্পের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

Joyjit Sengupta

Joyjit Sengupta

Author from Orange Prime News

Aug 27, 2026
5 min read
1
Share:
ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের জেরেই বিপর্যয়? নেপালের হড়পা বানের নেপথ্যে কী

উত্তর নেপালের রসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বানের পর থেকেই বিপর্যয়ের উৎস নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। আকাশে উদ্ধারকারী কপ্টার চক্কর কাটছে, নীচে জলের তোড়ে বিপর্যস্ত জনপদ। বহু মানুষ আটকে পড়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাঁধা—এত অল্প সময়ে এত বিপুল জল এল কোথা থেকে?

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় নেপালের সংশ্লিষ্ট এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টির কোনও স্পষ্ট খবর পাওয়া যায়নি। ফলে সাধারণ অতিবৃষ্টির কারণে এই বন্যা হয়েছে, এমন ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ বরং পাহাড়ি এলাকায় তুষারধস এবং নদীর গতিপথে সাময়িক বাধা তৈরির সম্ভাবনার দিকে নজর দিচ্ছেন।

তুষারধসেই কি তৈরি হয়েছিল বিপদ?

ভূবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও হিমবাহ বা পাহাড়ি ঢাল থেকে তুষার, বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নদীর গতিপথে এসে পড়ে থাকতে পারে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে যায়।

উজানে জল জমতে থাকলে সেই অস্থায়ী বাধার পিছনে ক্রমশ জলস্তর ও চাপ বাড়তে থাকে। কোনও পর্যায়ে বরফ-পাথরের সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল জলরাশি একসঙ্গে নীচের দিকে নেমে আসতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের আকস্মিক জলপ্রবাহই ভয়াবহ হড়পা বানের রূপ নিতে পারে।

এই সম্ভাবনাই এখন রসুয়ার বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নজরে রয়েছে। কারণ, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় এত দ্রুত জলপ্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নদীর গতিপথে অস্থায়ী বাধা ভেঙে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

তিব্বতে অতিভারী বৃষ্টির তথ্য

ভূগোলের গবেষক এবং চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ মধুসূদন কর্মকারও এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে উত্তর নেপালে মেঘভাঙা বৃষ্টির খবর না থাকলেও উপগ্রহচিত্রে তিব্বত অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

এর ফলে তিব্বতের উঁচু পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টির পাশাপাশি বরফ ও পাথরের স্তূপ সরে গিয়ে নদীর গতিপথে কোনও বাধা তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

অর্থাৎ বিপর্যয়ের উৎস নেপালের ভেতরে না হয়ে সীমান্তের ওপারের কোনও পাহাড়ি অঞ্চল থেকেও হতে পারে। তিব্বত থেকে অতিরিক্ত জল নেমে আসা কিংবা কোনও অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

লেন্ডে নদী নিয়েই বাড়ছে নজর

বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে লেন্ডে নদী। কাঠমান্ডুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণেও তুষারধসের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

জলবায়ু গবেষক শাশ্বত সান্যালের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে লেন্ডে নদীতে পরপর দু’বার বন্যা হয়েছে। ফলে নদী ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। তার উপর এবার যদি তুষারধসের কারণে আচমকা বিপুল জল নদীতে ঢুকে থাকে, তাহলে জলপ্রবাহের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

এই পরিস্থিতিতে নদীর তীরবর্তী বসতি, সেতু, রাস্তা এবং অন্যান্য পরিকাঠামো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগও কমে যায়।

তৈরি হয়েছিল কি অস্থায়ী হ্রদ?

‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তুষারধসের কারণে লেন্ডে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে একটি অস্থায়ী হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছিল।

পাহাড়ি নদীর পথে এ ধরনের প্রাকৃতিক বাধা তৈরি হলে তার পিছনে বিপুল জল জমতে পারে। সেই বাধা যদি কোনও কারণে ভেঙে যায়, তাহলে সঞ্চিত জল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নীচের দিকে নেমে আসে।

রসুয়ার হড়পা বানের ক্ষেত্রেও এমন কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি এই তত্ত্ব সত্যি হয়, তাহলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টির হিসাব দিয়ে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে না। বরং মূল কারণ হবে উজানে জমে থাকা জল এবং পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে যাওয়া।

ভূমিকম্পের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

তবে শুধুই তুষারধস নয়, একই সময় তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে তুষারধসের সময়ের কাছাকাছি ভূমিকম্পের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভূমিকম্পই যে বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ কারণ, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। ভূগোল গবেষক মধুসূদন কর্মকারও জানিয়েছেন, তিনি ভূমিকম্প সংক্রান্ত কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনও পাননি।

ফলে ভূমিকম্পের বিষয়টি আপাতত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দেখছেন, কোনও কম্পনের ফলে পাহাড়ি ঢালে বরফ-পাথরের স্তর সরে গিয়ে তুষারধস হয়েছিল কি না। আবার সেই তুষারধস নদীর গতিপথ আটকে দিয়ে পরে বিপুল জলপ্রবাহের জন্ম দিয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কি যোগ রয়েছে?

এই বিপর্যয়কে ঘিরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ গলন, বরফের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়া এবং হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ বা জলাধারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে রসুয়ার নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রয়োজন।

এখন উপগ্রহচিত্র, নদীর গতিপথ, তুষারধসের চিহ্ন এবং উজানের জলস্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি। এই তথ্যগুলি মিললেই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

উদ্ধারকাজেও বড় চ্যালেঞ্জ

রসুয়ার বিপর্যয়ে শুধু কারণ অনুসন্ধান নয়, উদ্ধারকাজও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হড়পা বানের জেরে নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গতদের কাছে পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে।

আকাশপথে কপ্টার ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া এবং নিরাপদে নামার জায়গার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কারণ, অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে পরবর্তী পর্যায়েও আচমকা জলপ্রবাহ বাড়তে পারে।

এখন কোন তত্ত্ব সবচেয়ে জোরালো?

এই মুহূর্তে কোনও একটি কারণকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তুষারধস → নদীর গতিপথে অস্থায়ী বাধা → জল জমে যাওয়া → বাধা ভেঙে আকস্মিক জলপ্রবাহ—এই সম্ভাব্য ঘটনাক্রমটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে তিব্বতের অতিভারী বৃষ্টি যুক্ত হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভূমিকম্পের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি।

অর্থাৎ, রসুয়ার বিপর্যয় হয়তো কোনও একক প্রাকৃতিক ঘটনার ফল নয়। তুষারধস, অতিবৃষ্টি, নদীর গতিপথে বাধা এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সম্মিলিত প্রভাবেই ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

তদন্ত ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাই নিশ্চিতভাবে ‘ভূমিকম্প’ বা ‘তুষারধস’—কোনও একটিকে বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ বলা ঠিক হবে না। তবে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশে এই ধরনের আকস্মিক বিপর্যয় যে ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, রসুয়ার ঘটনা সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।

Tags:India
Advertisement
#6
Advertisement
#7
Advertisement
#8
Advertisement
#9
Advertisement
#10