তসলিমার অনুষ্ঠানেই অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা
শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার রবীন্দ্রসদনে লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে সংবর্ধনা জানাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজজগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে বাংলার মাটিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ছিল প্রবল আগ্রহ। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সংবর্ধনা পর্ব শেষ হওয়ার পর বক্তব্য রাখতে মঞ্চে ওঠেন তসলিমা।
বক্তৃতা শুরুর আগে তিনি দর্শকাসনে বসে থাকা কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে আসার অনুরোধ জানান। আমন্ত্রণ পেয়ে জয় গোস্বামী নিজের আসন ছেড়ে মঞ্চের দিকে এগোতেই হলের একাংশ থেকে আপত্তির সুর শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই প্রতিক্রিয়া জোরালো হয়ে ওঠে এবং গোটা প্রেক্ষাগৃহে হইচই শুরু হয়।
দর্শকদের আপত্তির মুখে ফিরে যান জয় গোস্বামী
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে দেখে জয় গোস্বামী কোনও বিতর্ক বাড়াতে চাননি। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া বুঝেই তিনি মঞ্চে না উঠে ফিরে গিয়ে নিজের নির্ধারিত আসনে বসে পড়েন। তবে তাতেও উত্তেজনা সঙ্গে সঙ্গে প্রশমিত হয়নি। কয়েক মিনিট ধরে প্রেক্ষাগৃহে শোরগোল চলতে থাকে।
এই সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা তসলিমা নাসরিন বক্তব্য শুরু করতে পারেননি। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং আয়োজকরাও বারবার মাইকে উপস্থিত দর্শকদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। কিন্তু প্রথম দিকে সেই আহ্বানে বিশেষ সাড়া মেলেনি।
তসলিমার আহ্বানেই ফের স্বাভাবিক পরিবেশ
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেই এগিয়ে আসেন তসলিমা নাসরিন। তিনি মাইক্রোফোনে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে শান্ত হওয়ার আবেদন জানান এবং প্রশ্ন তোলেন, তিনি আদৌ বক্তব্য রাখবেন কি না যদি এই হট্টগোল চলতেই থাকে।
লেখিকার এই আবেদন কার্যকর হয়। ধীরে ধীরে দর্শকরা শান্ত হন এবং প্রেক্ষাগৃহে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে। এরপর তিনি নির্বিঘ্নে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ফলে সম্ভাব্য বড় বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হয়।
কেন তৈরি হল এই প্রতিক্রিয়া?
ঘটনার পর সাংস্কৃতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। অনেকের মতে, তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক এবং তাঁকে নিয়ে সাহিত্যিক মহলের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। দর্শকদের একাংশের ধারণা, জয় গোস্বামী অতীতে এই প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করেননি। আবার কেউ কেউ তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গও টেনে আনছেন।
যদিও এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চে বা পরে জয় গোস্বামী কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি। একইভাবে তসলিমাও ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আলাদা করে কোনও মন্তব্য করেননি। ফলে দর্শকদের আপত্তির প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও বিভিন্ন মহলে জল্পনা অব্যাহত।
অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করল সাময়িক বিতর্ক
এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে সম্মান জানানো এবং তাঁর সাহিত্যচর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু সাময়িক এই বিশৃঙ্খলা সেই মূল বার্তার উপর কিছুটা হলেও ছায়া ফেলেছে।
তবে আয়োজকদের দাবি, কয়েক মিনিটের অস্বস্তি কাটিয়ে অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা অনুযায়ীই সম্পন্ন হয়েছে। উপস্থিত অধিকাংশ দর্শকই পরে মনোযোগ দিয়ে লেখিকার বক্তব্য শোনেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে নতুন বিতর্ক
রবীন্দ্রসদনের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মঞ্চও এখন মতাদর্শগত বিভাজন থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। কোনও ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দর্শকদের আবেগ বা মতপার্থক্য প্রকাশের ঘটনা নতুন নয়, কিন্তু তা যদি অনুষ্ঠান পরিচালনায় প্রভাব ফেলে, তাহলে সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ স্বাভাবিক হলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভিন্নমত প্রকাশের ধরন নিয়েও সংযম প্রয়োজন। অন্যদিকে, অনেকের বক্তব্য, দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। ফলে এই ঘটনার পর স্বাধীন মতপ্রকাশ, সাংস্কৃতিক পরিসরের সহনশীলতা এবং শিল্পী-সাহিত্যিকদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রবীন্দ্রসদনের এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি অনুষ্ঠানের সাময়িক বিঘ্ন নয়; এটি বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন অনুষ্ঠানে মতবিরোধ কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে এই ঘটনা।



