ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মৃত্যু
দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায়। গত প্রায় এক বছর ধরে ক্যানসারের চিকিৎসা চলছিল মুম্বইয়ে। সেখানেই রবিবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়।
মুম্বইয়ে থাকলেও বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে তাঁর পরিচিতি কখনও মুছে যায়নি। বরং দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে থাকার পরও তাঁর অভিনীত ছবিগুলি তাঁকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে দর্শকের স্মৃতিতে।
মিঠুর প্রয়াণের খবর সামনে আসতেই বাংলা চলচ্চিত্র মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও সামাজিক মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁর কাজ এবং স্মৃতি দর্শকের মধ্যে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে বলেই জানিয়েছেন তিনি।
‘মর্জিনা আবদুল্লা’ থেকেই বদলে যায় কেরিয়ার
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ‘মর্জিনা আবদুল্লা’। দীনেন গুপ্ত পরিচালিত এই ছবিতে মর্জিনা চরিত্রে অভিনয় করে দ্রুত দর্শকের নজরে আসেন তিনি।
এর আগে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করলেও প্রথম দিকের ছবিগুলিতে সেই অর্থে বড় পরিচিতি তৈরি হয়নি। কিন্তু ‘মর্জিনা আবদুল্লা’র সাফল্যের পর মিঠুর সামনে খুলে যায় নতুন দরজা। তাঁর অভিনয়, পর্দার উপস্থিতি এবং স্বতন্ত্র সৌন্দর্য তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
এর পর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বাংলা ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ‘নিশিকন্যা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হোটেল স্নো ফক্স’, ‘ভাগ্যচক্র’ এবং ‘সন্ধি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে।
‘মৌচাক’-এর মিঠু আজও দর্শকের মনে
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারিত হলেই যে ছবিটির কথা অনেকের আগে মনে পড়ে, সেটি ‘মৌচাক’। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এই ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের বিপরীতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
সেই ছবিতে তাঁর পর্দার উপস্থিতি ছিল একেবারেই আলাদা। সৌন্দর্যের পাশাপাশি সহজাত অভিনয় এবং চরিত্রের স্বাভাবিক উপস্থাপনা তাঁকে দর্শকের কাছে আরও আপন করে তুলেছিল।
‘মৌচাক’-এর সাফল্যের পর মিঠু শুধুমাত্র গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী হিসেবে নয়, অভিনয় দক্ষতার জন্যও পরিচিতি পান। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যে একটা স্বাভাবিকতা ছিল, যা সেই সময়ের বাংলা ছবির দর্শকদের সঙ্গে সহজেই সংযোগ তৈরি করেছিল।
‘স্বয়ংসিদ্ধা’ থেকে একাধিক জনপ্রিয় ছবি
সত্তরের দশকে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের কেরিয়ার দ্রুত এগিয়ে যায়। ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য় তাঁর অভিনয়ও দর্শকের নজর কেড়েছিল। একই সময়ে বাংলা ছবির একাধিক পরিচিত অভিনেতা ও পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।
তাঁর ছবির তালিকায় যেমন বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় সিনেমা ছিল, তেমনই ছিল এমন কিছু ছবি যেখানে চরিত্রের গুরুত্ব ছিল বেশি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সিনেমার পরিচিত নায়িকাদের তালিকায় জায়গা করে নেন।
উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিকের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন মিঠু। তাঁর অভিনয়জীবনের বিস্তার মূলত সাতের ও আটের দশক জুড়ে।
বাংলা পেরিয়ে হিন্দি সিনেমাতেও
শুধু টলিউডেই থেমে থাকেননি মিঠু। হিন্দি সিনেমাতেও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহর ‘খান দোস্ত’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক হয়।
এর পর ‘সফেদ ঝুঠ’, ‘দিল্লাগি’ এবং ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’-র মতো হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। যদিও বাংলা ছবির মতো দীর্ঘ সময় হিন্দি সিনেমায় কাজ করেননি, তবু তাঁর এই অধ্যায়টি অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষার ছবিতেই কাজ করার ফলে তাঁর পরিচিতি বাংলা চলচ্চিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছিল।
অভিনয় থেকে সরে গিয়েও রয়ে গেলেন আলোচনায়
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবন খুব দীর্ঘ ছিল না। আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর তিনি ধীরে ধীরে সিনেমা থেকে সরে যান। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯০ সালে চন্দ্র বারোটের ‘আশ্রিতা’ ছবিতে আবার বড়পর্দায় ফেরেন।
‘আশ্রিতা’ই শেষ পর্যন্ত তাঁর শেষ ছবি হয়ে থাকে। ছবিটির পর আর নিয়মিত অভিনয়ে ফেরেননি তিনি। বরং ধীরে ধীরে জনসমক্ষে উপস্থিতি কমিয়ে ব্যক্তিগত জীবনেই মন দেন।
এই অন্তরালে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় একজন অভিনেত্রীর হঠাৎ করে প্রচারের আলো থেকে সরে যাওয়া দর্শকের কৌতূহল বাড়িয়েছিল।
কেন আজও এতটা মনে রাখা হয় মিঠুকে?
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবন দীর্ঘ না হলেও তাঁর ছবির সংখ্যা এবং চরিত্রগুলির জনপ্রিয়তা তাঁকে স্থায়ী জায়গা দিয়েছে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে।
তাঁর ক্ষেত্রে শুধু সৌন্দর্যের প্রসঙ্গ নয়, অভিনয়ের স্বাভাবিকতা এবং চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘মর্জিনা আবদুল্লা’র প্রাণবন্ত চরিত্র থেকে ‘মৌচাক’-এর পরিচিত পর্দা-ব্যক্তিত্ব—বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
এই কারণেই বহু বছর অভিনয় না করেও তাঁর নাম নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও পরিচিত থেকেছে। পুরনো বাংলা সিনেমার পুনঃপ্রচার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছবি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অভিনয়ও নতুন করে দর্শকের সামনে এসেছে।
‘আশ্রিতা’ হয়ে রয়ে গেলেন দর্শকের মনে
১৯৯০ সালের ‘আশ্রিতা’ ছিল মিঠুর শেষ চলচ্চিত্র। তারপর আর ক্যামেরার সামনে দেখা যায়নি তাঁকে। কিন্তু শেষ ছবির পরও তাঁর অভিনয়জীবনের স্মৃতি মুছে যায়নি।
বরং সময় যত এগিয়েছে, ততই তাঁর অভিনীত পুরনো ছবিগুলির গুরুত্ব বেড়েছে। বাংলা সিনেমার যে সময়টিকে সত্তর ও আশির দশকের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়, সেই সময়ের অন্যতম পরিচিত অভিনেত্রী ছিলেন মিঠু।
তাঁর প্রয়াণে সেই প্রজন্মের আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান হল।
ব্যক্তিগত জীবন ছিল অনেকটাই আড়ালে
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও মিঠু মুখোপাধ্যায় পরবর্তী জীবনে সংবাদমাধ্যম এবং প্রকাশ্য জীবন থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। মুম্বইয়ে বসবাস করলেও নিয়মিত জনসমক্ষে দেখা যেত না তাঁকে।
তাই অসুস্থতার খবরও দীর্ঘদিন খুব একটা প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর খবর সামনে আসার পরই নতুন করে তাঁর জীবন ও চলচ্চিত্রজীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একদিকে দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্মৃতি, অন্যদিকে বহু বছর ধরে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা—এই দুইয়ের মিলনেই মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনযাত্রা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা হয়ে রয়েছে।
বাংলা সিনেমা হারাল এক স্বতন্ত্র অভিনেত্রীকে
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ শুধু একজন অভিনেত্রীর মৃত্যু নয়, বাংলা সিনেমার একটি বিশেষ সময়েরও বিদায়। সাতের ও আটের দশকে যাঁরা বাংলা ছবির দর্শকদের বিনোদন দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মিঠুর জায়গা ছিল স্বতন্ত্র।
‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘নিশিকন্যা’ কিংবা ‘আশ্রিতা’—ছবির নাম বদলেছে, চরিত্র বদলেছে, কিন্তু দর্শকের মনে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি থেকে গিয়েছে।
ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৭১ বছর বয়সে তাঁর জীবন থেমে গেল। কিন্তু পর্দায় রেখে যাওয়া চরিত্রগুলি তাঁকে বাংলা সিনেমার দর্শকদের স্মৃতিতে আরও দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখবে।



