হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি তৈলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনার পরপরই মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। ওই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে এ ধরনের প্রাণঘাতী আক্রমণ কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় জয়শংকর জানান, তিনি মার্কিন বিদেশসচিবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার। ওমানের শিনাস বন্দরের কাছে গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী এমটি জলবীর নামে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। জাহাজটিতে মোট ২০ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন। হামলার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হলেও তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেই বিবৃতিতে জানানো হয়, ইরানের তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে জলপথে যে অবরোধ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে, তা অমান্য করার জেরেই সংশ্লিষ্ট জাহাজটি হামলার মুখে পড়ে। মার্কিন বাহিনীর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিষয়টি শুধু তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, ঘটনাটিকে ঘিরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও সামনে এসেছে। সম্প্রতি ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, ওয়াশিংটন নাকি তেহরানের উত্থাপিত বেশিরভাগ শর্ত মেনে নিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তবে সেই দাবি উড়িয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের তরফে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনও মিল নেই। তাঁর অভিযোগ, ইরান ভুল তথ্য ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
এরপরই ভারতীয় জাহাজ সংক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া ভারতীয় জাহাজগুলির উপর ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছিল ইরান। মার্কিন বাহিনী সেই হামলা প্রতিহত করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট করে জানাননি, কোন ভারতীয় জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছিল বা কীভাবে সেই হামলা ব্যর্থ করা হয়। ফলে তাঁর এই মন্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ভারত অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে। ফলে এই ধরনের সংবেদনশীল ইস্যুতে নয়াদিল্লি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে।
তবে ভারতীয় নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনায় কেন্দ্র যে কঠোর বার্তা দিতে চায়, বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন ভারতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক তেলের বাজার, সামুদ্রিক পরিবহণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার উপরও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু নতুন করে বিশ্বের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। হামলার প্রকৃত দায়, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এখন সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে আন্তর্জাতিক মহল।



