দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা আন্দোলন শনিবার নতুন মোড় নিল। টানা ২০ দিন ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়া সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে সকালে পুলিশ সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করায়। প্রশাসনের দাবি, তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সুপারিশ এবং আদালতের নির্দেশ মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের পর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্দোলনের মঞ্চ থেকে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতা অভিজিৎ দীপক জানান, তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসবেন। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছতে গেলে দিল্লি পুলিশ তাঁকে বাধা দেয়, এমনকি শারীরিকভাবে হেনস্তা করে আটকও করা হয়।
দীপকের এই অভিযোগ নিয়ে এখনও পুলিশের তরফে আলাদা করে কোনও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যন্তর মন্তর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং জমায়েত নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।
এদিকে ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে পুলিশের উপস্থিতি আরও বাড়ানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা খালি করার অনুরোধ জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। প্রশাসনের দাবি, পরিস্থিতি যাতে উত্তপ্ত না হয় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কোনও প্রভাব না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আগামী ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে একটি মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন সোনম ওয়াংচুক ও তাঁর সমর্থকেরা। সেই কর্মসূচির মাত্র দু'দিন আগে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা জোরদার হওয়ায় আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আন্দোলনকারীদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপে আন্দোলনের গতি থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও প্রশাসন সেই অভিযোগ মানতে নারাজ।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সোনম ওয়াংচুকের পরিবারের সদস্যরাও সেখানে পৌঁছে যান। তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন, তাঁর স্বামীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করা হোক। পাশাপাশি চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ না করার আবেদনও জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবারই গীতাঞ্জলি যন্তর মন্তরে গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সে সময় তিনি অনশন তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ওয়াংচুক নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তবে শনিবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতির জেরে পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
দিল্লি পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত এবং আদালতের নির্দেশ অনুসরণ করেই ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, তাঁর জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও জোরালো হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের একাংশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের দাবি, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ বা অতিরিক্ত পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ কাম্য নয়। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম দায়িত্ব।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরেই যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কড়া করা হয়েছিল। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল বলেও তাঁদের দাবি। যদিও দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখন নজর রয়েছে অভিজিৎ দীপকের ঘোষিত অনশন কর্মসূচির দিকে। সোনম ওয়াংচুক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব কোন পথে এগোয়, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে ২০ জুলাইয়ের নির্ধারিত সংসদ অভিমুখে মিছিল আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আন্দোলনের মুখ, অন্যদিকে নতুন করে অনশন শুরুর ঘোষণা—এই দুই ঘটনার জেরে রাজধানীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসন যেমন নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর জোর দিচ্ছে, তেমনই আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবি আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। ফলে আগামী কয়েক দিন এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে সবার।



