বিহারে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। রাজ্যের ৭০তম বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা BPSC পরীক্ষা বাতিল করে ফের পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে মঙ্গলবার পাটনায় বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। সেই বিক্ষোভে আচমকাই নজর কাড়ে মাত্র ছয় বছরের এক শিশু। নাম আদিত্য। মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিতে তাকে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওকে কেন্দ্র করেই ঘটনাটি সামনে এসেছে। তবে ভিডিওগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, টি-শার্ট ও ডেনিম প্যান্ট পরা শিশুটির কপালে তিলক রয়েছে। জানা গিয়েছে, পাটনার পুনাইচক এলাকার একটি বস্তিতে তার পরিবারের সঙ্গে থাকে আদিত্য।
বিক্ষোভে কী করছিল ছয় বছরের শিশু?
মঙ্গলবার BPSC পরীক্ষা বাতিল-সহ একাধিক দাবিতে চাকরিপ্রার্থীরা রাস্তায় নামেন। সেই আন্দোলনের ভিড়েই দেখা যায় আদিত্যকে। বয়সে ছোট হলেও ক্যামেরার সামনে তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়।
একটি ভিডিওতে শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, পড়ুয়ারা কেন চাকরি পাচ্ছেন না এবং সরকার যে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা কোথায়—এই প্রশ্ন তুলছে সে। এরপর মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিও জানাতে দেখা যায় তাকে।
অন্য একটি ভিডিওতে পুলিশের পদক্ষেপের প্রসঙ্গেও মন্তব্য করতে শোনা যায় আদিত্যকে। তার এই বক্তব্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
তবে শিশুটি নিজের ইচ্ছায় বিক্ষোভে এসেছিল, নাকি পরিবারের কোনও সদস্য বা অন্য কারও সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তার বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পরিস্থিতি নিয়েও পুলিশের তরফে বিস্তারিত কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশ কেন শিশুটিকে সরিয়ে নিয়ে গেল?
বিক্ষোভ চলাকালীন কিছু সময় পর কয়েকজন পুলিশকর্মী আদিত্যকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। এই দৃশ্যের ভিডিওও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরেই প্রশ্ন ওঠে, ছয় বছরের শিশুকে কি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে?
পুলিশ অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রশাসনের বক্তব্য, শিশুটিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিক্ষোভস্থলে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় তাকে নিরাপদে সরিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পরে শিশুটিকে তার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনও আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার বা আটক মামলা ছিল না; বরং পরিস্থিতির মধ্যে শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরানো হয়েছিল।
BPSC পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে কেন আন্দোলন?
বিহারে সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ৭০তম BPSC পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষার্থীদের একাংশ নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পরীক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই দাবিতেই মঙ্গলবার পাটনায় বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়।
BPSC-র মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ রাজনৈতিক আলোচনারও বিষয় হয়ে উঠেছে। চাকরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
শিশুর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
আদিত্যর বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি পুলিশি পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক মহলেও তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, একটি ছয় বছরের শিশুকে প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যাওয়ায় বিক্ষোভের প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
একইসঙ্গে শিশুটিকে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে বিক্ষোভে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এত অল্প বয়সের কোনও শিশুর রাজনৈতিক বিক্ষোভে উপস্থিতি তার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি প্রাপ্তবয়স্কদের প্রভাব ছিল—তা স্পষ্ট নয়।
এই বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিশুটির বক্তব্যকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি করা হলেও ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট এখনও পরিষ্কার নয়।
পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন
শিশুটিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে, পুলিশের দাবি নিরাপত্তার কারণেই তাকে সরানো হয়েছিল। অন্যদিকে, সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এত ছোট একটি শিশুকে কেন বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে থানায় নিয়ে যেতে হল।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভস্থলে ভিড় ও উত্তেজনার মধ্যে শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। পরে তাকে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে ঘটনাটির অন্য কোনও আইনি দিক রয়েছে কি না, কিংবা শিশুটির পরিবারের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
কর্মসংস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন
আদিত্যর বক্তব্যের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হল চাকরি ও কর্মসংস্থান। বিহারে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের অসন্তোষের পাশাপাশি যুব সমাজের কর্মসংস্থান নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের।
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, সময়মতো ফল প্রকাশ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার দাবি বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ফলে BPSC আন্দোলন শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে রাজ্যের বৃহত্তর কর্মসংস্থান পরিস্থিতির প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
এই আবহেই ছয় বছরের একটি শিশুকে চাকরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে কথা বলতে দেখা যাওয়ায় ঘটনাটি আরও বেশি মানুষের নজরে এসেছে।
এখন কী জানা যাচ্ছে?
এখন পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্য, আদিত্যকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং নিরাপত্তার কারণে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলির সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ফলে শিশুটির বক্তব্য, বিক্ষোভে তার উপস্থিতির কারণ এবং পুলিশ তাকে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বা সমাজমাধ্যমের দাবির বাইরে পুলিশের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
BPSC পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন অবশ্য এই ঘটনার বাইরেও চলমান। পরীক্ষা বাতিল ও নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনকারীদের পরবর্তী কর্মসূচি কী হয়, এবং সরকার ও কমিশন তাঁদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর।
সব মিলিয়ে, BPSC পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে পাটনার বিক্ষোভে ছয় বছরের আদিত্যর উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের স্লোগান থেকে শুরু করে পুলিশের তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া—ঘটনার প্রতিটি দিক নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তবে শিশুটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে যে দাবি ছড়িয়েছে, পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করতে আরও তথ্যের অপেক্ষা থাকছে।



