অচল সংসদ, তবু থামেনি বিল পাশ
বাদল অধিবেশনের শুরু থেকেই সংসদে বিরোধী দলগুলির বিক্ষোভ অব্যাহত। বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রের জবাবদিহি চেয়ে সরব হয়েছেন কংগ্রেস-সহ বিরোধী সাংসদরা। একাধিকবার স্লোগান, ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ এবং হইহট্টগোলের জেরে লোকসভা ও রাজ্যসভা মুলতুবি করতে হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিক নিয়মে আইন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্য এবং সাংসদদের মতামত জানানোর সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হয়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি, বিরোধীরাই পরিকল্পিতভাবে সংসদের কাজ বন্ধ করে দিচ্ছেন।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই একটি বিষয় নজর কেড়েছে—সংসদে কাজের সময় কম হলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের গতি কমেনি। যে সময়টুকু সংসদ সচল থেকেছে, সেই সময়ের মধ্যেই একাধিক বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছে।
১৫ ঘণ্টার কিছু বেশি কাজ লোকসভায়
অধিবেশনের বুধবার পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, লোকসভায় কাজ হয়েছে মাত্র ১৫ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট। রাজ্যসভায় অবশ্য তুলনামূলকভাবে বেশি সময় অধিবেশন চলেছে—২৪ ঘণ্টা ২১ মিনিট।
দুই কক্ষেরই স্বাভাবিকভাবে প্রায় ৯০ ঘণ্টা করে কাজ করার কথা ছিল। সেই তুলনায় প্রকৃত কাজের সময় অনেকটাই কম। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের বড় অংশই হট্টগোল, বিক্ষোভ এবং মুলতুবির কারণে নষ্ট হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে কার্যত সীমিত সময়ই ছিল। সেই সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলি অনুমোদনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের হিসাবে মোট ১৯টি বিল পাশ হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে পাশের সময়।
পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১০টি বিল নিয়ে গড়ে চার মিনিটেরও কম সময় ব্যয় হয়েছে। ফলে এই ১০টি বিলের ক্ষেত্রে মোট আলোচনার সময় ৪০ মিনিটেরও কম বলে দাবি করা হচ্ছে।
কেন এত তাড়াহুড়ো, প্রশ্ন বিরোধীদের
বিরোধী শিবিরের মূল অভিযোগ, সংসদে কোনও বিল পাশ করার আগে তার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিলকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য শোনা উচিত। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই একাধিক বিল অনুমোদিত হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও'ব্রায়েন এই দ্রুততার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, সংসদে আইন পাশের প্রক্রিয়া যেন দ্রুত খাবার তৈরির গতিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে একাধিক বিল অত্যন্ত অল্প সময়ে পাশ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
বিরোধীদের দাবি, সংসদ শুধু ভোটাভুটির জায়গা নয়। আইন তৈরির আগে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন দলের মতামত শোনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই আলোচনা ছাড়াই যদি বিল দ্রুত অনুমোদিত হয়, তাহলে আইনের গুণগত মান এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ডেরেকের অভিযোগ, এই ধরনের প্রক্রিয়ায় সংসদের ভূমিকা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীদের বক্তব্য রাখার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত আইন পাশ করানো হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ
তবে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্য একটি দিকও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, বিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা চাইলেও বিরোধীরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যাতে সংসদ চলাই কঠিন হয়ে পড়ছে বলে কেন্দ্রের অভিযোগ।
অধিবেশনের শুরুতে বিরোধীদের একাধিক দাবি সামনে এসেছিল। কখনও রাম মন্দিরের অনুদান সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আলোচনার দাবি উঠেছে, কখনও পড়ুয়াদের বিষয় নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী শিবির। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিও উঠেছিল।
পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে পড়ুয়াদের উপর পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি দাবি করে বিরোধীরা। সরকার সেই বিষয়ে বিবৃতি দিতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে। কিন্তু এরপরও নতুন ইস্যু সামনে এনে বিরোধীরা সংসদের অচলাবস্থা বজায় রাখছে বলে অভিযোগ কেন্দ্রের।
অর্থাৎ সরকার বলছে, বিরোধীদের দাবির একাংশ মেনে নেওয়ার পরেও বিক্ষোভ থামছে না। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, সরকারের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়, সংসদের মেঝেতে বিস্তারিত আলোচনা এবং জবাবদিহিই তাঁদের মূল দাবি।
সময়ের অভাবের সুযোগ নিচ্ছে সরকার?
রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি এখন প্রশ্ন উঠছে সংসদীয় কার্যপ্রণালী নিয়েও। অধিবেশনের একটি বড় অংশ যদি হট্টগোলের কারণে নষ্ট হয়, তাহলে সরকার কি অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল পাশ করানোর অধিকার রাখে? সাংবিধানিক এবং সংসদীয় নিয়মের দিক থেকে সরকার সেই সুযোগ পেলেও, রাজনৈতিকভাবে তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
কারণ একটি বিল কয়েক মিনিটে পাশ করা মানেই যে সেটি আইন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমনটা নয়। আবার কোনও বিল গুরুত্বপূর্ণ হলে তার প্রতিটি ধারা নিয়ে সাংসদদের বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজনও থাকতে পারে। ফলে একই সঙ্গে দুই পক্ষের দায়ের প্রশ্ন সামনে আসছে।
বিরোধীরা যদি প্রতিদিন সংসদ অচল করে দেন, তাহলে আইন নিয়ে আলোচনার সময় কমে যায়। আবার সেই সীমিত সময়েই সরকার যদি একাধিক বিল দ্রুত পাশ করিয়ে নেয়, তাহলে বিরোধীরা অভিযোগ তোলেন যে সংসদীয় আলোচনাকে পাশ কাটানো হচ্ছে। দুই অবস্থার মাঝেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক।
১৯ বিলের পাশের হিসাব ঘিরে নতুন বিতর্ক
এখন পর্যন্ত সরকার মোট ১৯টি বিল পাশ করিয়েছে বলে যে হিসাব সামনে এসেছে, তা থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। বিশেষ করে ১০টি বিলের ক্ষেত্রে গড় সময় চার মিনিটেরও কম হওয়ায় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, এত অল্প সময়ে কীভাবে প্রতিটি বিলের বিষয়বস্তু নিয়ে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব?
সরকারপক্ষ অবশ্য বলতে পারে, বিলগুলি আগে থেকেই সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে এবং সাংসদদের হাতে প্রয়োজনীয় নথি ছিল। ফলে আলোচনার সময় কম হলেও আইন পাশের প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, নথি হাতে থাকা এবং সংসদের মেঝেতে প্রকাশ্য বিতর্ক—দুটি এক জিনিস নয়।
এই বিতর্কের মধ্যেই আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাশ করানো আর সর্বসম্মত বা বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে আইন তৈরি করার মধ্যে ভারসাম্য কোথায় থাকা উচিত?
অচলাবস্থা বনাম দ্রুত আইন প্রণয়ন
বাদল অধিবেশনের এই পরিস্থিতি মূলত ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির পুরনো দ্বন্দ্বকেই সামনে আনছে। বিরোধীদের কাজ সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আবার সরকারের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু যখন এক পক্ষের প্রতিবাদে সংসদ অচল হয়ে যায় এবং অন্য পক্ষ সেই সীমিত সময়ের মধ্যে দ্রুত আইন পাশ করে, তখন দুই পক্ষের ভূমিকাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান অধিবেশনে তাই শুধু কতগুলি বিল পাশ হল, সেটাই নয়—কতটা সময় নিয়ে সেগুলি নিয়ে আলোচনা হল, কোন বিল কমিটি পর্যায়ে গেল এবং সাংসদদের মতামত কতটা বিবেচিত হল, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভ সংসদের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে কেন্দ্রের ঝড়ের গতিতে বিল পাশ করানো নিয়েও উঠছে আপত্তি। ফলে বাদল অধিবেশনের শেষ পর্বে সংসদীয় কাজের গতি এবং তার মান—দুই নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



