রাজধানী দিল্লিতে সংসদ অভিযানের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোমবার ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি দ্রুত অশান্ত হয়ে ওঠে এবং ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে দিল্লি পুলিশ।
ঘটনার জেরে যন্তর মন্তর এবং তার আশপাশের এলাকা কার্যত নিরাপত্তার বলয়ে পরিণত হয়। পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্যকে মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের দাবি, সংসদ চত্বরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় আগেভাগেই কড়া সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল।
দিল্লি পুলিশ আগেই স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সংসদ অভিযানের জন্য কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশের বক্তব্য, সংসদ ভবন এবং তার সংলগ্ন এলাকা দেশের অন্যতম সংবেদনশীল নিরাপত্তা অঞ্চল। ফলে সেখানে অনুমতি ছাড়া কোনও ধরনের মিছিল বা জমায়েতের অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।
পুলিশের তরফে আরও জানানো হয়েছিল, যদি আন্দোলনকারীরা সংসদের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন, তবে আইন অনুযায়ী তাদের আটকানো হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৩ ধারার অধীনে জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এই নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ ছিল।
তবে আন্দোলনকারীরা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি থেকে সরে আসেননি। সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে তাঁদের সমাবেশ শুরু হয়। পরে মিছিল সংসদের দিকে এগোতে শুরু করলে পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। অভিযোগ, একাংশ ব্যারিকেড সরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জের সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ।
ঘটনার পর এলাকায় সাময়িক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলেও পরে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। যদিও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংসদ এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার করতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। যন্তর মন্তর, সংসদ ভবন, সেন্ট্রাল ভিস্তা এবং সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপের জন্য বিশেষ দলও প্রস্তুত রাখা হয়।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে দিল্লি মেট্রো পরিষেবাতেও। নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট এবং সেবা তীর্থ—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই স্টেশনগুলিতে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকবে। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও নির্দিষ্ট স্টেশনগুলিতে ট্রেন থামছিল না।
প্রশাসনের মতে, সংসদীয় অধিবেশন চলাকালীন সময়ে রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনিতেই কঠোর থাকে। তার মধ্যে বড় আকারের বিক্ষোভ বা মিছিল আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই আগেভাগেই বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এই আন্দোলনের পটভূমিতে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত কয়েকটি দাবিকে কেন্দ্র করে চলা বিক্ষোভ। আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবি জানিয়ে আসছেন। সেই দাবিগুলি সংসদের সামনে তুলে ধরতেই এই অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এর আগে যন্তর মন্তরে অনশন কর্মসূচিও চলছিল। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক দীর্ঘ সময় ধরে অনশন চালানোর পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং আদালতের নির্দেশ মেনেই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওয়াংচুক জানান, সরকার যদি তাঁর উত্থাপিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে অন্তত একটি গ্রহণ করে, তবে অনশন প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বিবেচনা করবেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও তা জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার সীমার মধ্যেই হতে হবে। সংসদ ভবনের মতো অতি-সংবেদনশীল এলাকায় অনুমতি ছাড়া মিছিলের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সোমবারের ঘটনার পর রাজধানীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে প্রশাসন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে বলে সূত্রের খবর। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলির ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



