চিনই আগামী দিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী?
ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম এম নারাভানে। তাঁর মতে, সন্ত্রাসবাদের কারণে দীর্ঘদিন পাকিস্তান ভারতের প্রধান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হলেও ভবিষ্যতের দিক থেকে চিনই হয়ে উঠতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
নিজের নতুন বই দ্য কিউরিয়াস অ্যান্ড দ্য ক্লাসিফায়েড: আনআর্থিং মিলিটারি মিথস অ্যান্ড মিস্ট্রিজ-এর প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারাভানে বলেন, ভারত ইতিমধ্যেই চিন ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই সংঘাতে জড়িয়েছে এবং উভয়ের সঙ্গেই সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
তাঁর মতে, আগামী দিনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ভারত ও চিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
‘শান্তি চাইলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকুন’
চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারাভানের মূল বার্তা, সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু একইসঙ্গে সামরিক প্রস্তুতিতেও কোনও ঘাটতি রাখা যাবে না।
তিনি বলেন, “যদি শান্তি চান, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন।”
তবে চিনকে সরাসরি ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার পথে হাঁটেননি প্রাক্তন সেনাপ্রধান। তাঁর মতে, শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনা এবং কূটনৈতিক উপায়ে মতপার্থক্য মেটানোর চেষ্টা করা উচিত।
আলোচনার পাশাপাশি শক্তিশালী সামরিক প্রতিরোধ
নারাভানের বক্তব্য অনুযায়ী, বেজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা ভারতের নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু সম্ভাব্য কোনও আগ্রাসন বা অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ প্রতিহত করার মতো সামরিক সক্ষমতাও বজায় রাখতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শক্তি প্রয়োগ সবসময়ই শেষ বিকল্প হওয়া উচিত। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে যাতে ভারত দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তার জন্য দেশের সামরিক প্রস্তুতি সর্বদা শক্তিশালী রাখতে হবে।
অর্থাৎ, নারাভানের মতে কূটনীতি এবং সামরিক প্রতিরোধ—দুই পথই পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
গালওয়ানের সংঘাতের সময় সেনাপ্রধান ছিলেন নারাভানে
এম এম নারাভানে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের সেনাপ্রধান ছিলেন। তাঁর সেনাপ্রধান থাকার সময়ই ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়।
সেই ঘটনার পর থেকেই ভারত-চিন সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা একসঙ্গে চলেছে। ফলে চিনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নারাভানের মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পাকিস্তানও থাকবে ভারতের চ্যালেঞ্জ
শুধু চিন নয়, পাকিস্তানকেও ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নারাভানে। তাঁর বক্তব্য, দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেই ভারতের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং অতীতে উভয়ের সঙ্গেই যুদ্ধ হয়েছে।
তবে তাঁর মতে, সন্ত্রাসবাদের ধারাবাহিক হুমকির কারণে এতদিন ভারতের নিরাপত্তা ভাবনায় পাকিস্তানই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ভবিষ্যতে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চিনের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
কূটনীতিই প্রথম পথ, শক্তি প্রয়োগ শেষ বিকল্প
চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারাভানের অবস্থান মূলত দ্বিমুখী—একদিকে সংলাপ, অন্যদিকে প্রস্তুতি।
তাঁর বক্তব্য, মতপার্থক্য মেটাতে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে এবং শক্তি প্রয়োগকে শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু একইসঙ্গে দেশের সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ভারত কার্যকরভাবে তা প্রতিহত করতে পারে।
প্রাক্তন সেনাপ্রধানের এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তাই ফের সামনে এল।



