রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই নানাবিধ বিতর্ক, তদন্ত এবং আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশের একটি পুরনো মানহানি মামলায় নতুন মোড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্রের খবর, কয়েক বছর আগে একটি রাজনৈতিক সভায় বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গীয়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন অভিষেক। অভিযোগ, সেই সভায় তিনি কৈলাসকে ‘গুন্ডা’ বলে উল্লেখ করেন। এরপরই কৈলাসের ছেলে ও বিজেপি নেতা আকাশ বিজয়বর্গীয় ভোপালের বিশেষ এমপি-এমএলএ আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করেন।
মামলা রুজু হওয়ার পর আদালতের তরফে বারবার সমন পাঠানো হলেও অভিষেক ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা দেননি বলে অভিযোগ। একাধিকবার আদালতের নির্দেশ অমান্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে নিম্ন আদালত।
পরবর্তী সময়ে ওই পরোয়ানার বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তৃণমূল সাংসদ। আদালত প্রাথমিকভাবে তাঁকে স্বস্তি দিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছিল। সেই রক্ষাকবচের জোরেই এতদিন তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ থেকে রেহাই পেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু বুধবার সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। জানা গিয়েছে, হাই কোর্ট পূর্বে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে নিম্ন আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আর কোনও অন্তর্বর্তী বাধা রইল না। আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এখন স্থানীয় আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যে কোনও সময় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। কারণ, ইতিমধ্যেই একাধিক মামলায় তদন্তকারী সংস্থার নজরে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় সই জালিয়াতির অভিযোগে তাঁকে বহুবার তলব করেছে সিআইডি। প্রথমদিকে কয়েকটি হাজিরা এড়িয়ে গেলেও পরে আদালতের নির্দেশ মেনে ভবানীভবনে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে।
এছাড়া নির্বাচনী প্রচারের সময় ডিজে সংক্রান্ত মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও পৃথক একটি মামলায় তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেই মামলাতেও তদন্তকারীদের সামনে হাজিরা দিয়েছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও সম্প্রতি তাঁকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। গত সপ্তাহেই কলকাতার সিজিও কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রায় গোটা দিন তদন্তকারীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তৃণমূল নেতাকে।
এদিকে রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে শাসক-বিরোধী সমীকরণেও বড় রদবদল হয়েছে। নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরমহলে অভিষেককে ঘিরে অসন্তোষের খবর সামনে এসেছে। বিভিন্ন বৈঠকে দলের একাংশ তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। এমনকি তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরানোর দাবিও ওঠে বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় চাপে যখন অভিষেকের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি অস্বস্তিকর, ঠিক সেই সময় মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের এই সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল।
তবে তৃণমূলের একাংশের দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি পরিকল্পিতভাবে অভিষেককে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই সব অভিযোগের মোকাবিলা করবেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ।
অন্যদিকে বিজেপি শিবিরের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। দীর্ঘদিন ধরে সমন সত্ত্বেও হাজিরা না দেওয়ার ফলেই পরিস্থিতি এই জায়গায় পৌঁছেছে।
এখন নজর থাকবে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে। মধ্যপ্রদেশের আদালত নতুন করে কোনও নির্দেশ দেয় কি না, কিংবা অভিষেকের আইনজীবীরা পুনরায় উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন কি না, তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এই মামলার ভবিষ্যৎ শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আইনি অবস্থানই নয়, আগামী দিনে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।



