আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও রেপো রেটে স্থিতাবস্থা, ইএমআই বাড়ছে না আপাতত
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আর্থিক চাপের আবহে ভারতের মুদ্রানীতি কী হবে, তা নিয়ে জল্পনা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে রেপো রেটে কোনও পরিবর্তন না এনে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)।
তিন দিনব্যাপী মুদ্রানীতি কমিটির (Monetary Policy Committee) বৈঠক শেষে আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানান, কমিটির ছয় সদস্যই সর্বসম্মতভাবে বর্তমান রেপো রেট বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে আগামী নীতিগত পর্যালোচনা পর্যন্ত রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশেই থাকবে।
রেপো রেট হল সেই সুদের হার, যার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করে। এই হার বাড়লে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ঋণের সুদের হারও বৃদ্ধি পায়। আবার রেপো রেট কমলে ঋণ সস্তা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই রেপো রেট অপরিবর্তিত থাকায় আপাতত বাড়ি, গাড়ি ও ব্যক্তিগত ঋণের মাসিক কিস্তি বা ইএমআইয়ে কোনও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
আরবিআই প্রতি দু'মাস অন্তর মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের অবস্থা পর্যালোচনা করে রেপো রেট নির্ধারণ করে। এবারও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সূচকগুলি খতিয়ে দেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রধান লক্ষ্য।
তবে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি প্রথম ত্রৈমাসিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে বলে আরবিআই জানিয়েছে। উৎপাদন, পরিষেবা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার মতো একাধিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যদিও বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের।
রেপো রেটের সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছর একাধিক ধাপে সুদের হার কমিয়েছিল আরবিআই। প্রথমে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে রেপো রেট ৫.৫০ শতাংশে নামানো হয়। পরে আরও ধাপে ধাপে সুদের হার কমিয়ে ডিসেম্বর মাসে তা ৫.২৫ শতাংশে আনা হয়। তারপর থেকে দীর্ঘ আট মাস ধরে একই হার বজায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপের কারণে এই মুহূর্তে নতুন করে সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথই বেছে নিয়েছে আরবিআই।
রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার ফলে ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রেও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী এবং শিল্পক্ষেত্রও নীতিগত ধারাবাহিকতার বার্তা পেল।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং সোনার রিজার্ভ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ধরে রাখতে বিপুল পরিমাণ সোনা বিক্রি করা হয়েছে। তবে সেই দাবি স্পষ্টভাবে খারিজ করেছে আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনার রিজার্ভ নিয়ে প্রকাশিত ওই তথ্য বাস্তবসম্মত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও আগামী মাসগুলিতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, জ্বালানির দাম এবং মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতির ওপরই ভবিষ্যতের মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।



