রামমন্দিরে দানের অর্থ নিয়ে বিতর্কে নতুন মোড়
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর অর্থে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন আগে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, রামমন্দিরের প্রণামী বাক্স থেকে কোটি কোটি টাকা উধাও হয়ে গিয়েছে। তাঁর দাবি, দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের বিশ্বাসের সঙ্গে এই ঘটনা জড়িত এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
অখিলেশের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। তিনি বলেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার, পরে তদন্তে সম্মতি
প্রাথমিক পর্যায়ে রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট অভিযোগের সত্যতা মানতে রাজি হয়নি। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দানের অর্থ নিয়ে কোনও ধরনের অনিয়মের প্রমাণ তাদের হাতে নেই।
তবে পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক নথি খতিয়ে দেখার সময় কিছু সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সামনে আসে বলে সূত্রের দাবি। এরপরই ট্রাস্টের তরফে রাজ্য সরকারের কাছে বিস্তারিত তদন্তের আবেদন জানানো হয়।
জানা গিয়েছে, ট্রাস্টের প্রধান নৃপেন্দ্র মিশ্র এবং সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই দিল্লি থেকে অযোধ্যায় এসে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। আর্থিক নথিপত্র এবং দানের অর্থের লেনদেনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করার পরই তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
তিন সদস্যের সিট গঠন যোগী সরকারের
ট্রাস্টের অনুরোধ পাওয়ার পর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দ্রুত পদক্ষেপ করেন। তাঁর নির্দেশে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে।
এই তদন্তকারী দলে রয়েছেন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের তিন আধিকারিক। তাঁদের মধ্যে একজন সিনিয়র আইএএস অফিসার, একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক এবং রাজ্যের অর্থদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন। তদন্তে আর্থিক লেনদেন, দানের অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকগুলি খতিয়ে দেখা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
সরকারি মহলের দাবি, রামমন্দিরে ভক্তদের দানের অর্থের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কোনও অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া হবে না। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনার চেষ্টা করা হবে।
আদালতের দ্বারস্থ আইনজীবী
এদিকে বিষয়টি আদালতেরও নজরে এসেছে। আইনজীবী মোহিত অশোক এলাহাবাদ হাই কোর্টের লখনউ বেঞ্চে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর আবেদনে এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের মাধ্যমে ট্রাস্টের হিসাবের বিশেষ ফরেনসিক অডিট করার আবেদনও করেছেন। তাঁর যুক্তি, বিপুল পরিমাণ দানের অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত হওয়াই উচিত।
আবেদনকারী দাবি করেছেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দানের অর্থের হিসাব নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি সামনে এসেছে। সেই কারণেই একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
চার কর্মী গ্রেপ্তার, উদ্ধার অর্থ
সূত্রের খবর, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত চার কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে ধৃতদের মধ্যে এক জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পরই অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যদিও ট্রাস্টের কিছু প্রতিনিধি এখনও প্রকাশ্যে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।
তবে অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, প্রথম দিকে যেভাবে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল, তা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সেই কারণেই তাঁরা কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের দাবিতে অনড়।
রাজনৈতিক চাপের কেন্দ্রে অযোধ্যা
রামমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে দানের অর্থ নিয়ে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক তাৎপর্যও তৈরি করেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভক্তদের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অন্যদিকে রাজ্য সরকার এবং ট্রাস্টের দাবি, অভিযোগ সামনে আসার পর দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কোনও তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে না।
এখন নজর সিটের তদন্ত এবং হাই কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। তদন্তে যদি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।



