অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামী চুরি সংক্রান্ত মামলায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অভিযান এখনও বিভিন্ন জেলায় চলছে এবং আরও নগদ অর্থ ও নথি উদ্ধার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র সাম্প্রতিক নয়, গত প্রায় দু’বছর ধরে মন্দিরে জমা হওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান অলঙ্কারের একটি অংশ নিয়মিতভাবে আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। তদন্তকারীদের অনুমান, এই চক্রে শুধুমাত্র কয়েকজন কর্মচারী নয়, মন্দির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই মামলায় ইতিমধ্যেই আট জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে চুরি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, চুরি হওয়া সম্পত্তি গোপন রাখা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতি দমন আইনের একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন লবকুশ ও অনুকল্প। তদন্তে জানা গিয়েছে, তাঁরা মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা এবং নথিভুক্ত করার দায়িত্বে ছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, এই দুই অভিযুক্তের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে ট্রাস্টের প্রাক্তন সদস্য অনিল মিশ্রের সঙ্গে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত রামশঙ্কর মিশ্রের অতীত সম্পর্কও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি একসময় ট্রাস্টের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। পরে ২০২২ সালে মন্দির নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। এছাড়া অবিনাশ শুক্ল, মণীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে এবং সুভাষ শ্রীবাস্তব-সহ আরও কয়েকজন এই মামলায় ধৃত হয়েছেন।
গ্রেফতারির পরদিনই ট্রাস্টে বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে। সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন চম্পত রাই। একইসঙ্গে ট্রাস্টির পদ ছেড়ে দেন অনিল মিশ্রও। যদিও তাঁদের বিরুদ্ধে এখনও সরাসরি কোনও অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তদন্তকারীরা তাঁদের সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রামমন্দির উদ্বোধনের পর প্রথম কয়েক মাস প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রণামী জমা পড়ত। পরে সেই অঙ্ক ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক প্রণামী সংগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সেই অস্বাভাবিক প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত তদন্তের সূত্রপাত ঘটায়।
পুলিশের দাবি, প্রণামী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সেবাদার দীর্ঘদিন ধরে সিসিটিভির নজর এড়িয়ে নগদ অর্থ ও সোনাদানা সরিয়ে ফেলছিলেন। তদন্তে আরও জানা যাচ্ছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। রিসর্ট, শপিং কমপ্লেক্সসহ একাধিক খাতে সেই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রাথমিক রিপোর্টে মোট ১৭ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দেড়শো সেবাদারের আর্থিক লেনদেন এবং সম্পত্তির বিবরণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, মন্দির চালু হওয়ার পর তাঁদের মধ্যে অনেকের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
এই তালিকায় ফুলকান্ত মিশ্র নামে এক ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তিনি ট্রাস্টের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। তাঁর সম্পত্তি বৃদ্ধির উৎস নিয়েও তদন্ত চলছে।
এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, শুধুমাত্র নিম্নস্তরের কর্মীদের গ্রেফতার করে প্রকৃত প্রভাবশালীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকার প্রণামী দীর্ঘদিন ধরে আত্মসাৎ করা সম্ভব নয় যদি না প্রশাসনের উচ্চস্তরে কারও সহযোগিতা থাকে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান অলোক কুমারও প্রকাশ্যে চম্পত রাইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং সমস্ত দায়ীদের আইনের আওতায় আনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে রামমন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্র মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনার জন্য স্থায়ীভাবে একজন প্রধান নির্বাহী আধিকারিক (CEO) নিয়োগের সুপারিশ করেছেন। তাঁর মতে, এত বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো থাকা অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এই ঘটনায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জানিয়েছেন, ভক্তদের বিশ্বাসের সঙ্গে কোনও ধরনের প্রতারণা বরদাস্ত করা হবে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকার শূন্য-সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করবে বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
তদন্তকারী সংস্থার মতে, এখনও অনেক তথ্য সামনে আসা বাকি। উদ্ধার হওয়া অর্থ, ব্যাংক লেনদেন, সম্পত্তির নথি এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে রামমন্দিরের প্রণামী চুরি মামলার তদন্ত আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি কেবল একটি চুরির ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংগঠিত আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে পরিণত হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও, এখন গোটা দেশের নজর রয়েছে এই বহুল আলোচিত মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে।



