নিট ইউজি ২০২৬-এর পুনঃপরীক্ষার আগে ফের প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কায় তৎপর কেন্দ্রীয় সরকার। পরীক্ষাকে ঘিরে সম্ভাব্য জালিয়াতি ও ভুয়ো তথ্যের রমরমা ঠেকাতে আগামী ২২ জুন পর্যন্ত দেশে সাময়িকভাবে টেলিগ্রাম পরিষেবার অ্যাক্সেস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) সুপারিশের ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এই পদক্ষেপ করেছে বলে সূত্রের খবর।
আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে নিট ইউজি ২০২৬-এর পুনঃপরীক্ষা। তার আগেই তদন্তকারী সংস্থার নজরে আসে, টেলিগ্রামের একাধিক চ্যানেলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দাবি করে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রশ্নপত্র পাইয়ে দেওয়ার নামে বহু পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ।
এনটিএ-র দাবি, গত কয়েক মাস ধরে এমন একাধিক টেলিগ্রাম চ্যানেলের উপর নজরদারি চালানো হচ্ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, ‘পেপার লিকড লিট’, ‘রি-নিট ২০২৬’, ‘রি নিট মাফিয়া’-সহ বেশ কিছু চ্যানেল প্রকাশ্যে প্রশ্নপত্র জোগাড় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন বলে দাবি করে সম্পাদিত স্ক্রিনশটও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি অর্থ হাতানোর জন্যই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করছে এনটিএ।
পরীক্ষা কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ধরনের দাবির কোনও ভিত্তি নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি ভুয়ো এবং প্রতারণামূলক প্রচার। তবুও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল। সেই পরিস্থিতিতে কোনও ধরনের গুজব যাতে নতুন করে পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে না ফেলে, তা নিশ্চিত করতেই এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২ মে প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী নিট ইউজি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এরপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ধৃতদের মধ্যে কয়েকজন অধ্যাপক এবং পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি রয়েছেন। অভিযোগ, তাঁরা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে গোটা ঘটনার পর এনটিএ-র নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় পরীক্ষাকর্তৃপক্ষ।
তবে পুনঃপরীক্ষার আগেই নতুন করে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কেন্দ্রের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ভুয়ো প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি জালিয়াত চক্রগুলি আর্থিক প্রতারণারও ফাঁদ পেতে রেখেছে। সেই কারণেই এবার আগেভাগে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
এনটিএ জানিয়েছে, শুধু টেলিগ্রামের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞাই নয়, পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করার পর্যায় থেকেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। যাঁরা প্রশ্ন তৈরি করবেন, তাঁদের সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া কড়া নজরদারির মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
প্রশ্নপত্রের অনুবাদ, যাচাই, মুদ্রণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া— প্রতিটি ধাপকে একাধিক স্তরের নিরাপত্তার আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল পর্যবেক্ষণও বাড়ানো হয়েছে।
সূত্রের খবর, প্রশ্নপত্র পরিবহণের ক্ষেত্রেও এবার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বায়ুসেনার বিমান ব্যবহার করা হতে পারে। প্রশ্নপত্র পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনো পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াকে কড়া নিরাপত্তার বলয়ে রাখা হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে এবং কোনও ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটকে ঘিরে গত কয়েক বছরে প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ফলে পরীক্ষার প্রতি পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের আস্থা বজায় রাখতে এবার প্রশাসন কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সেই কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রুখতে সাময়িকভাবে টেলিগ্রাম বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখন দেখার, এই অতিরিক্ত নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের ফলে পুনঃনিট পরীক্ষা কতটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায় এবং প্রশ্নফাঁসের বিতর্ক থেকে বেরিয়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা কতটা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।



