দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের আবহে কঠোর আইন প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি সূত্রের খবর, Public Examination (Prevention of Unfair Means) Act, 2024-এ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
সূত্রের দাবি, সংশোধিত আইনে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে ন্যূনতম তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হতে পারে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই সাজা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি অন্তত ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার প্রস্তাবও রয়েছে।
শুধু ব্যক্তি নয়, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যদি অনিয়মে জড়িত বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের জন্যও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, এমন ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সরকারি মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে পরবর্তী পর্যায়ে সংশোধনী বিল সংসদে পেশ করা হতে পারে।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রশ্নপত্র ফাঁস শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এবং তাঁদের পরিবারের আস্থার ওপর আঘাত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক মাসে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর সরকার ধারাবাহিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তদন্ত এগিয়েছে, একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ যাতে নষ্ট না হয়, সেটিও সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
এর আগেই কেন্দ্র প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নতুন আইনি সংশোধনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করাই নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রশ্নফাঁস ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে। ছাত্র সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের অভিযোগ, কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
এই আবহেই শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেরও সম্ভাবনা রয়েছে। জানা গিয়েছে, আন্দোলনকারীদের অনুরোধে বৈঠকের স্থান হিসেবে একটি নিরপেক্ষ ভেন্যু বেছে নেওয়া হয়েছে। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক শীর্ষ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন।
সরকারের আশা, একদিকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির দাবি, শুধু আইনের সংশোধন নয়, পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর শুক্রবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে। সেখানে যদি সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন পায়, তাহলে প্রশ্নফাঁস রোধে দেশের আইনি কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পথ খুলে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আরও কঠোর বার্তা যাবে বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের একাংশ।



