দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বহুচর্চিত কুস্তিগির যৌন হেনস্তা মামলায় বড় রায় দিল দিল্লির আদালত। ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি তথা বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিল দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, মামলায় পেশ করা সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
এই মামলায় ব্রিজভূষণের পাশাপাশি অভিযুক্ত ছিলেন কুস্তি ফেডারেশনের প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক বিনোদ তোমরও। আদালত তাঁকেও বেকসুর খালাস করেছে। অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট অশ্বিনী পানওয়ারের এজলাসে এই মামলার রায় ঘোষণা হয়।
২০২৩ সালে দেশের একাধিক মহিলা কুস্তিগির ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগির ভিনেশ ফোগট-সহ আরও কয়েকজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়। অভিযোগ ঘিরে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হয় দীর্ঘ আন্দোলন। কুস্তিগিরদের সেই প্রতিবাদ দ্রুত জাতীয় স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রথম দিকে পুলিশ অভিযোগ নিতে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন আন্দোলনকারীরা। পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপের পর দিল্লি পুলিশ এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত শেষে দিল্লি পুলিশ আদালতে প্রায় ১,৫০০ পাতার চার্জশিট জমা দেয়। সেখানে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪, ৩৫৪এ, ৩৫৪ডি এবং ৫০৬(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর পাশাপাশি বিনোদ তোমরকেও মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার শুনানি চলাকালীন অভিযোগকারী কুস্তিগির, তদন্তকারী আধিকারিক, বিশেষ তদন্তকারী দলের সদস্য এবং কুস্তি ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৩০ জনেরও বেশি সাক্ষীর বক্তব্য আদালতে রেকর্ড করা হয়েছিল।
দীর্ঘ শুনানির পর গত ২ জুলাই আদালত মামলার রায় সংরক্ষণ করে। এরপর ৩ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দিনেই আদালত জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে যে ধরনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন, তা মামলার নথিতে পাওয়া যায়নি।
রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে ব্রিজভূষণ শরণ সিং বলেন, আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে। তিনি দাবি করেন, শুরু থেকেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন এবং বিচার ব্যবস্থার উপর তাঁর আস্থা ছিল।
অন্যদিকে, এই মামলা ঘিরে ২০২৩ সালের আন্দোলন ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছিল। ভিনেশ ফোগট, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়ার মতো দেশের পরিচিত কুস্তিগিররা ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
যন্তর মন্তরের সেই আন্দোলন শুধু কুস্তি ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য, খেলোয়াড়দের অধিকার এবং অভিযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছিল।
বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে আদালতের এই রায় সেই দীর্ঘ বিতর্কিত অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও অভিযোগকারী কুস্তিগিরদের পক্ষ থেকে এখনও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি আইনি স্বস্তি পেলেও, ২০২৩ সালের সেই আন্দোলন ভারতীয় ক্রীড়াঙ্গনে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে যে আলোচনা শুরু করেছিল, তা এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গিয়েছে।



