Home/Entertainment/পঁচিশে বৈশাখ — বিশ্বকবির জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
Advertisement
#16
Advertisement
#17
Advertisement
#18
Advertisement
#19
Advertisement
#20

পঁচিশে বৈশাখ — বিশ্বকবির জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক অনন্ত আলোকের উৎস

Joyjit Sengupta

Joyjit Sengupta

Author from Orange Prime News

May 9, 2026
•5 min read•
274
Share:
পঁচিশে বৈশাখ — বিশ্বকবির জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ পঁচিশে বৈশাখ। বাংলা পঞ্জিকার এই তারিখটি শুধু একটি দিন নয় — এটি একটি অনুভূতি, একটি চেতনা, একটি জাতির আত্মার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই পবিত্র দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন এক অসাধারণ মানুষ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলা সাহিত্যের সোনার ফসল, যাঁর কণ্ঠস্বর আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হয়, যাঁর দর্শন আজও পথ দেখায় বিশ্বমানবতাকে।

পঁচিশে বৈশাখ তাই আমাদের কাছে শুধু একটি জন্মদিন পালনের উৎসব নয় — এটি নিজেদের শেকড়ের কাছে ফিরে আসার দিন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুন করে চেনার দিন।

জোড়াসাঁকোর শিশু থেকে বিশ্বকবি

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মে (বাংলায় ২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান হিসেবে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। ঠাকুরবাড়ি ছিল সেই যুগের বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সংগীত, সাহিত্য, দর্শন ও সমাজচিন্তার এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র ছিল সেই পরিবার।

ছোটবেলায় প্রথাগত শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথের মন বসেনি। স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে তাঁর মুক্ত মন আটকে থাকতে চায়নি। তবে প্রকৃতি ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। জোড়াসাঁকোর বাড়ির বাগান থেকে শুরু করে পদ্মার বুকে বজরায় ভাসতে ভাসতে, গ্রাম বাংলার রোদ-মাখা সকাল থেকে শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে সন্ধ্যার আলোয় — প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে অফুরন্ত অনুপ্রেরণা।

মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। পনেরো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বনফুল'। এরপর থেকে আর পেছনে তাকাননি। একের পর এক সৃষ্টি করে গেছেন — কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ — বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি তাঁর স্বর্ণস্পর্শ রেখে যাননি।

কবিতার জগতে এক অপরাজেয় কণ্ঠস্বর

রবীন্দ্রনাথ প্রথম ও প্রধানত একজন কবি। তাঁর কবিতায় রয়েছে জীবনের সমস্ত রং — প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা, মানবতা, দেশপ্রেম। 'সোনার তরী', 'চিত্রা', 'কল্পনা', 'খেয়া', 'বলাকা', 'পুনশ্চ' — এই কাব্যগ্রন্থগুলি বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন সম্পদ।

তাঁর 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য স্থান অধিকার করে নিয়েছে। ১৯১৩ সালে এই গ্রন্থের জন্যই তিনি পান নোবেল পুরস্কার — এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই সম্মানে ভূষিত হন তিনি। গীতাঞ্জলির পাতায় পাতায় রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক সন্ধান, ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে প্রেমের সেতু:

"আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে..."

এই লাইনগুলি পড়লে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুধু ছন্দ ও অলংকারের খেলা নয় — এটি এক গভীর দার্শনিক যাত্রা।

গানের জগতে রবীন্দ্রনাথ — রবীন্দ্রসংগীত

রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নন, তিনি একজন অসাধারণ সুরকারও। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলি 'রবীন্দ্রসংগীত' নামে পরিচিত। দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন তিনি — পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, বিচিত্র — বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা এই গানগুলি বাঙালির জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী।

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' এবং ভারতের জাতীয় সংগীত 'জনগণমন অধিনায়ক জয় হে' — উভয়ই রবীন্দ্রনাথের রচনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা যে একই কবির রচনা দুটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত।

রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির আত্মার ভাষা। বৃষ্টির দিনে 'আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে', শরতের ভোরে 'আজি এই আনন্দ জগতে', বিজয়ার বিদায়ে 'আনন্দ লোকে মঙ্গল লোকে' — রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া বাঙালির জীবন যেন অসম্পূর্ণ।

কথাসাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব এনেছিল। 'পোস্টমাস্টার', 'কাবুলিওয়ালা', 'ছুটি', 'নষ্টনীড়', 'দেনা-পাওনা', 'মেঘ ও রৌদ্র' — এই গল্পগুলি মানবজীবনের বিচিত্র দিক এত সহজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপস্থাপন করেছে যা পাঠককে আজও মুগ্ধ করে।

'কাবুলিওয়ালা' গল্পে একজন পাঠান ফেরিওয়ালা ও ছোট্ট মিনির মধ্যে যে নিষ্পাপ বন্ধুত্ব, তা পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসে। 'পোস্টমাস্টার'-এ রতনের নিঃসঙ্গ ভালোবাসার করুণ পরিণতি পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে বহুকাল।

উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথ অতুলনীয়। 'গোরা', 'ঘরে বাইরে', 'চোখের বালি', 'যোগাযোগ', 'শেষের কবিতা' — এই উপন্যাসগুলি সমাজ, প্রেম, রাজনীতি, নারীমুক্তি ও জাতীয়তাবাদের জটিল প্রশ্নগুলিকে মোকাবিলা করেছে অসামান্য দক্ষতায়। 'গোরা' উপন্যাসে ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের যে প্রশ্ন উঠেছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক।

শিক্ষাচিন্তা ও শান্তিনিকেতন

রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদও। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, যেখানে প্রকৃতির কোলে, মুক্ত পরিবেশে শিশুরা শিখবে — আনন্দের মধ্যে দিয়ে, জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে।

১৯০১ সালে পিতার আশ্রম বোলপুরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম', যা পরে পরিচিত হয় 'শান্তিনিকেতন' নামে। গাছের ছায়ায়, খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করা, শিল্প-সংস্কৃত-সংগীতের সাথে শিক্ষার সংযোগ — এই ধারণা তৎকালীন ভারতে ছিল সম্পূর্ণ নতুন।

১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হিসেবে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আজও বিশ্বভারতী ভারতের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সেই স্বপ্নকে বহন করে চলেছে।

সমাজ ও রাজনৈতিক চেতনা

রবীন্দ্রনাথ কখনো সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। রাখিবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যখন মনে হয়েছে জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতার দিকে যাচ্ছে, তখন সেই জোয়ার থেকে সরে এসেছেন।

১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত 'নাইটহুড' উপাধি ত্যাগ করেন। সে সময়ে এই সাহসী পদক্ষেপ সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছিল।

তিনি সাম্রাজ্যবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর 'নেশনালিজম' প্রবন্ধে তিনি অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ

অনেকেই জানেন না যে, রবীন্দ্রনাথ একজন উল্লেখযোগ্য চিত্রশিল্পীও ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে, মাত্র সত্তর বছর বয়স পেরিয়ে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। তাঁর চিত্রকলায় রয়েছে এক স্বতন্ত্র ভাষা — রহস্যময়, প্রতীকী, অতলান্তিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে এবং শিল্প সমালোচকরা তাঁর চিত্রকলাকে উচ্চমূল্যায়ন দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ

রবীন্দ্রনাথের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। পদ্মা-বিধৌত এই অঞ্চলে বহু বছর কাটিয়েছেন তিনি — শিলাইদহে, শাহজাদপুরে, পতিসরে। পদ্মার বুকে নৌকায় ভেসে ভেসে, গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে মিশে তিনি লিখেছেন তাঁর অসংখ্য অমর গান ও কবিতা।

পদ্মার চর, নদীর ধারের তালগাছ, বাউলের একতারা — এই বাংলার মাটি ও মানুষ তাঁর সৃষ্টিকে করেছে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান 'আমার সোনার বাংলা' হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের প্রতীক — আজ সেটিই সেই স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত।

জীবনের শেষ প্রহরে

জীবনের শেষ বছরগুলিতে শরীর ভেঙে পড়লেও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতা থামেনি। 'শেষলেখা' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক অসীম প্রাণশক্তির সাক্ষ্য দেয়। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে লেখা তাঁর শেষ কবিতা:

"তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি..."

এই পঙক্তিগুলি পড়লে অনুভব করা যায়, জীবনের অন্তিম সীমায় দাঁড়িয়েও তিনি কতটা সজাগ ছিলেন নিজের সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতায়।

১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যেখানে জন্ম, সেখানেই শেষ যাত্রা। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি? সেটি তো মৃত্যুহীন।

রবীন্দ্রনাথ কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

পঁচিশে বৈশাখ এলে প্রতি বছর আমরা প্রশ্ন করি — এই আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক? উত্তর একটাই — অসম্ভব প্রাসঙ্গিক।

যে যুগে মানুষ যন্ত্রের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই যুগে রবীন্দ্রনাথ মনে করিয়ে দেন মানবিকতার মূল্য। যে যুগে সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেই যুগে তাঁর 'জীবনদেবতা'র কথা মনে পড়িয়ে দেয় মানুষে মানুষে প্রেম ও ঐক্যের কথা। যে যুগে শিক্ষা হয়ে উঠেছে শুধু পরীক্ষা ও নম্বরের হিসাব, সেই যুগে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদর্শন দেখায় মুক্তিপথ।

তাঁর কথা আজও সত্যি: "আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশভরা..."

উপসংহার — পঁচিশে বৈশাখের শপথ

আজ পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে আমরা কেবল মালা দিই না, প্রদীপ জ্বালাই না — আমরা নিজেদের মনের ভেতরে একটু থামি, একটু ভাবি। তাঁর গানে কান দিই, তাঁর কবিতায় ডুব দিই, তাঁর জীবনদর্শন থেকে অনুপ্রেরণা নিই।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।" — এই কথাটি শুধু একটি গানের লাইন নয়, এটি জীবনের এক মহান পাঠ। নিজের পথে চলার সাহস, নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার শক্তি — রবীন্দ্রনাথ আমাদের এই দীক্ষা দিয়ে গেছেন।

বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, পঁচিশে বৈশাখ ততদিন আসবে বারবার — নতুন আলো নিয়ে, নতুন উদ্দীপনা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ মরেননি, মরবেনও না। তিনি আছেন আমাদের প্রতিটি গানে, প্রতিটি কবিতায়, প্রতিটি স্বপ্নে।

আজকের এই পবিত্র দিনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জন্মদিনের প্রণাম জানাই হে কবি, তোমার আলোয় আলোকিত এই ধরা। পঁচিশে বৈশাখ আসে বারে বারি, তোমার গানেই জীবন হয় ভরা।।

✦ ২৫শে বৈশাখ, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী ✦

Advertisement
#6
Advertisement
#7
Advertisement
#8
Advertisement
#9
Advertisement
#10