‘ফ্র্যাজাইল ৫’ প্রসঙ্গে মোদির কটাক্ষ
স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে দেশের অর্থনীতির বিবর্তনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে ‘ফ্র্যাজাইল ৫’-এর প্রসঙ্গ। এক সময় যে তালিকায় ভারতের নাম ছিল, বর্তমানে সেই ভারতই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে চলেছে—এই তুলনাই তুলে ধরেন তিনি।
মোদির বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ২০১৪ সালের আগে ভারতের অর্থনীতি একাধিক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে গত ১২ বছরে দেশ অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে বর্তমান অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আগের সরকারের সময়কার আর্থিক দুর্বলতার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ইউপিএ আমলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের সময়কার পরিবর্তনের তুলনা করে আসছে। স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চ থেকেও সেই রাজনৈতিক বক্তব্যই আরও একবার সামনে আনলেন প্রধানমন্ত্রী।
কী এই ‘ফ্র্যাজাইল ৫’?
‘ফ্র্যাজাইল ৫’ কোনও সরকারি বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী তালিকা নয়। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থা মরগ্যান স্ট্যানলি এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতিকে চিহ্নিত করেছিল। তাদের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক আর্থিক অস্থিরতা এবং বিদেশি পুঁজির প্রবাহে পরিবর্তনের মতো বাহ্যিক ধাক্কার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
ভারতের পাশাপাশি সেই তালিকায় ছিল ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং তুরস্ক। ওই সময় ভারতের অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগ ছিল বিপুল কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগের উপর নির্ভরতা।
বিশেষ করে ২০১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর উদীয়মান বাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছিল। এর প্রভাব ভারতীয় মুদ্রা এবং অর্থনীতিতেও পড়েছিল। সেই সময়কার পরিস্থিতিই ভারতকে ‘ফ্র্যাজাইল ৫’-এর তালিকায় নিয়ে আসে।
কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতিই ছিল বড় উদ্বেগ
ভারতের সেই সময়কার অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম সূচক ছিল কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি। ২০১২ সালে এই ঘাটতি দেশের জিডিপির ৫.১ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল।
সহজভাবে বললে, একটি দেশের বিদেশ থেকে পণ্য ও পরিষেবা কেনা এবং বিদেশে বিক্রি করার হিসাবের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ঘাটতি দেখা দেয়। ভারতের ক্ষেত্রে সেই সময় আমদানির পরিমাণ রফতানি আয়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় চাপ বাড়ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অপরিশোধিত তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বিপুল আমদানি ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও সেই সময় ভারতের বৈদেশিক লেনদেনের উপর চাপ তৈরি করছিল।
অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। টাকার দাম দ্রুত পড়ে যাওয়া সেই সময়কার অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম দৃশ্যমান চিহ্ন হয়ে ওঠে।
টাকার পতন ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ
২০১৩ সালে ভারতীয় মুদ্রার মূল্যপতন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এক পর্যায়ে ডলারের তুলনায় টাকার দাম রেকর্ড মাত্রায় নেমে যায়। এর ফলে আমদানিনির্ভর পণ্য, বিশেষ করে জ্বালানির খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তার প্রভাব সাধারণ মানুষের উপরও পড়ে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা তৎকালীন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একই সময়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারও আগের তুলনায় মন্থর হয়ে পড়েছিল।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণেই আন্তর্জাতিক আর্থিক মহলে ভারতকে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির একটি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। মরগ্যান স্ট্যানলির ‘ফ্র্যাজাইল ৫’ শব্দবন্ধ সেই পরিস্থিতিকেই তুলে ধরেছিল।
২০১৪-র পর বদলের দাবি
মোদির বক্তব্যের মূল জায়গা এখানেই। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের অর্থনীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য উন্নত হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও শক্তিশালী হতে শুরু করে।
ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান ধীরে ধীরে বদলায়। যে দেশকে কয়েক বছর আগেও বৈদেশিক আর্থিক ধাক্কার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল, সেই দেশই পরে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো উদীয়মান অর্থনীতিগুলির অন্যতম হয়ে ওঠে।
বিজেপির বক্তব্য, আর্থিক সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে।
মোদিও স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে এই পরিবর্তনকেই তাঁর সরকারের সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
‘চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ নিয়ে জোর
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে উঠে এসেছে।
গত এক দশকে ভারতের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলির তালিকায় ভারতের অবস্থানও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে।
লালকেল্লার ভাষণে মোদি সেই পরিবর্তনকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট স্পষ্ট—একদিকে অতীতের দুর্বলতার ছবি, অন্যদিকে বর্তমান ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান।
শুধু অর্থনীতি নয়, ২০৪৭-এর লক্ষ্যও সামনে
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে অর্থনীতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ভারতের লক্ষ্য নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যের কথা সামনে রেখে আত্মনির্ভরতার উপর জোর দেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে দেশীয় উৎপাদন, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভারতকে ভবিষ্যতের উন্নত দেশের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে ‘ফ্র্যাজাইল ৫’-এর প্রসঙ্গটি বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এটি শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক সূচকের উল্লেখ নয়, বরং ২০১৪ সালের আগের এবং পরের ভারতের তুলনা টানার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কংগ্রেসকে নিশানা, পাল্টা বিতর্কের সম্ভাবনা
মোদির এই বক্তব্যের মাধ্যমে ফের কংগ্রেসের আমলের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এল। বিজেপির দাবি, ২০১৪ সালের আগে ভারতের অর্থনীতি দুর্বলতা, মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ভারসাম্যের সমস্যায় ভুগছিল। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে বের করে এনেছে।
অন্যদিকে, অর্থনীতির পরিবর্তনকে শুধুমাত্র একটি সরকারের নীতির ফল হিসেবে দেখানো যায় কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পিছনে আন্তর্জাতিক বাজার, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কারণের ভূমিকাও রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের দিক থেকে মোদির বার্তা পরিষ্কার—এক দশকেরও বেশি সময় আগে যে ভারতকে ‘ফ্র্যাজাইল ৫’-এর মধ্যে রাখা হয়েছিল, আজ সেই দেশই বৈশ্বিক অর্থনীতির শীর্ষ সারিতে উঠে এসেছে। স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চ থেকে এই তুলনাকেই সামনে রেখে কংগ্রেসকে সরাসরি আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী।



