প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা নতুন নয়। বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা, তার খরচ এবং এর মাধ্যমে ভারতের কী লাভ হয়েছে—এই প্রশ্নে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে প্রায়ই মতপার্থক্য দেখা যায়। এবার সেই বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের খরচ এবং তার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ করল কেন্দ্র।
রাজ্যসভায় একাধিক সাংসদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোট ৭৪টি বিদেশ সফর করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মোট ২৩টি দেশ সফর করেন। এর মধ্যে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশও ছিল। ওই বছর বিদেশ সফরের জন্য খরচ হয়েছে ১৮০ কোটি টাকারও বেশি। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিদেশ সফরের খরচ হয়েছে প্রায় ৭৪.৫ কোটি টাকা।
কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের খরচ আগের তুলনায় কমেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই খরচ কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, শুধুমাত্র সফরের খরচ দিয়ে এই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগের মূল্যায়ন করা যায় না। কারণ রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সফরগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে মোট ৩৮১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এসেছে। সরকারের দাবি, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বিদেশ সফরের ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা রাজ্যসভায় জানান, ২০২১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সময় মোট ৩১৬টি সমঝোতাপত্র (MoU) বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিগুলি প্রযুক্তি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, শক্তি, বাণিজ্য এবং উদ্ভাবনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
কেন্দ্রের বক্তব্য, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক যেমন উন্নত হয়, তেমনই নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, শিল্পপতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর ফলে ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উৎপাদন ক্ষেত্র, প্রযুক্তি শিল্প এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলি আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সংখ্যা বেশি এবং এর আর্থিক ব্যয় নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, বিদেশ সফরের প্রকৃত ফলাফল সাধারণ মানুষের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত।
কেন্দ্র অবশ্য সেই অভিযোগ খারিজ করে জানিয়েছে, কূটনৈতিক সফরকে শুধুমাত্র ব্যয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। সরকারের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ভারতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক যোগাযোগ বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশি সংস্থাগুলি কোনও দেশে বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নীতিগত পরিবেশের বিষয়গুলি বিবেচনা করে। সেই দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরগুলিকে ভারতের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেই দেখা হয়।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ হলেও সরকার দাবি করছে, এর বিনিময়ে এসেছে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।



