ফের নিট ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে উত্তাল দেশ। রাজস্থানের জামওয়া রামগড় থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই ভাই মঙ্গিলাল ও দীনেশ বিওয়ালকে। তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য— গুরুগ্রামের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে ৩০ লক্ষ টাকায় কেনা হয়েছিল প্রশ্নপত্র। এরপর সেই প্রশ্ন বিভিন্ন পরীক্ষার্থী ও কোচিং নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। ইতিমধ্যেই গোটা ঘটনার তদন্তভার নিয়েছে সিবিআই। বাতিল হয়েছে ২০২৬ সালের NEET-UG পরীক্ষাও।
Main News:
ফের একবার সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET-UG-কে ঘিরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে তোলপাড় গোটা দেশ। ২০২৪ সালের বিতর্ক এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি, তার মধ্যেই ২০২৬ সালের পরীক্ষাতেও একই অভিযোগ সামনে আসায় প্রবল চাপে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। ইতিমধ্যেই ৩ মে অনুষ্ঠিত হওয়া NEET-UG 2026 পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনটিএ। তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সিবিআইকে।
এই মামলার তদন্তে নেমে রাজস্থান পুলিশ ও স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি) একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে। মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজস্থানের জামওয়া রামগড় এলাকার বাসিন্দা দুই ভাই— মঙ্গিলাল বিওয়াল ও দীনেশ বিওয়ালকে। তদন্তকারীদের দাবি, এই দুই ভাই পরীক্ষার অন্তত এক সপ্তাহ আগে গুরুগ্রামের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিটের প্রশ্নপত্র কিনেছিল।
পুলিশ সূত্রে খবর, ২৬ এপ্রিল ওই প্রশ্নপত্র তাদের হাতে পৌঁছয়। এরপর ২৯ এপ্রিল থেকেই তা ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয় বিভিন্ন পরীক্ষার্থী, কাউন্সেলিং এজেন্ট এবং কোচিং চক্রের মধ্যে। বিপুল টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, গোটা চক্রটি বহুস্তরীয় এবং দেশের একাধিক রাজ্যে এর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে।
ধৃত দুই ভাইয়ের মধ্যে দীনেশ বিওয়াল স্থানীয়ভাবে এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলেও জানা গিয়েছে। সেই কারণেই তদন্তে রাজনৈতিক যোগ রয়েছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাজস্থান পুলিশ ১৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
তদন্তকারীদের অনুমান, এই প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল কেন্দ্র রাজস্থানের সিকার জেলা। সিকার দীর্ঘদিন ধরেই মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষার কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত। সেখানে বহু বড় কোচিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। অভিযোগ, সেখানকার কিছু কোচিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, রামগড় থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে পৌঁছয় এমবিবিএস কাউন্সেলিং এজেন্ট রাকেশ কুমার মান্ডাওয়ারিয়ার হাতে। এরপর রাকেশ সেই প্রশ্নপত্র মোটা অঙ্কের টাকায় বিভিন্ন কোচিং সংস্থা ও পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে। এমনকি কেরালার এক এমবিবিএস পড়ুয়ার কাছেও মাত্র ৩০ হাজার টাকায় সেই প্রশ্ন বিক্রি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, পরীক্ষার অন্তত এক মাস আগে থেকেই কিছু পরীক্ষার্থীর হাতে তথাকথিত ‘সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র’ পৌঁছে গিয়েছিল। সেই প্রশ্নপত্রে মোট ৪১০টি প্রশ্ন ছিল বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল বিশাল বনশন। পরীক্ষার পর দেখা যায়, সেই প্রশ্নগুলির মধ্যে অন্তত ১২০টি রসায়ন প্রশ্ন আসল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে। শুধু প্রশ্ন নয়, উত্তর বিকল্পও একই ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের।
অন্য একটি তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ২৮১টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ১৩৫টি প্রশ্ন আসল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে গিয়েছে। এর ফলে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, তদন্তকারীরা মনে করছেন গোটা প্রশ্নফাঁসের উৎস সম্ভবত মহারাষ্ট্রের নাসিকের একটি ছাপাখানা। সেখান থেকেই একটি বড় ‘চেন নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বাইরে বেরিয়ে যায়। তারপর তা বিভিন্ন দালাল, কোচিং এজেন্ট এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছয়।
এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ Rahul Gandhi কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বারবার প্রশ্নফাঁস হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্র পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ। একইভাবে আপ সুপ্রিমো Arvind Kejriwal-ও কেন্দ্রকে আক্রমণ করে বলেছেন, দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।
ঘটনার জেরে ক্ষোভে ফুঁসছেন পরীক্ষার্থীরা এবং অভিভাবকেরা। প্রায় ২৩ লক্ষ পড়ুয়া এ বছরের NEET-UG পরীক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের অনেকেই মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় আবার নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হবে তাঁদের। নতুন পরীক্ষার দিন এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
এনটিএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।” সিবিআই ইতিমধ্যেই সমস্ত নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। তদন্তকারীরা বিভিন্ন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ব্যাঙ্ক লেনদেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া চ্যাট খতিয়ে দেখছেন।
২০২৪ সালেও নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। তখন ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের একটি স্কুল থেকে প্রশ্ন বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছিল সিবিআই। সেই মামলায় স্কুলের অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষ এবং একাধিক দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এবার ফের একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় জাতীয় স্তরে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষামহলের একাংশের মতে, বারবার এমন ঘটনা ঘটায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিবহণ ও সংরক্ষণের গোটা প্রক্রিয়ায় আরও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির জবাবদিহিও বাড়ানো দরকার।
এদিকে সিবিআই তদন্তে আরও বড় চক্র সামনে আসতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, শুধু রাজস্থান নয়, দেশের একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই এই প্রশ্নফাঁস হয়েছে। সেই কারণেই এখন নজর রয়েছে গ্রেপ্তার হওয়া দুই ভাইয়ের জেরা এবং ডিজিটাল প্রমাণের উপর।



