দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-কে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের জেরে বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র। নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছিল। সেই পরিস্থিতিতে এনটিএ-র বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বে থাকা ৪৭ জন আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিভাগীয় পদক্ষেপও করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এনটিএ-র ওপর দেশের একাধিক সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। নিট-ইউজি, জেইই মেন, সিইউইটি-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আয়োজন করে এই সংস্থা। প্রতি বছর কোটি কোটি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই পরীক্ষাগুলির উপর। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
নিট বিতর্কের সময় থেকেই বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠছিল, শুধু বাইরের চক্র নয়, পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থার মধ্যেও কোথাও দুর্বলতা থেকে থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটছে কেন্দ্র। সেই কারণেই সংস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র বদলি বা রদবদলে সীমাবদ্ধ নয়। এনটিএ-র পুরো কাজের ধরন, দায়িত্ব বণ্টন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার প্রক্রিয়াও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই— ভবিষ্যতে জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলিকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং প্রশ্নফাঁসমুক্ত করে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন এনটিএ-র বিভিন্ন স্তরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। সংবেদনশীল দায়িত্বে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের উপস্থিতি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বহু মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। এবার সেই ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র।
সূত্রের খবর, পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি আরও জোরদার করা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং দায়িত্ব নির্ধারণে কঠোর প্রটোকল চালুর মতো একাধিক প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র প্রস্তুতি থেকে শুরু করে পরিবহণ, সংরক্ষণ এবং মূল্যায়নের প্রতিটি স্তরে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্ত এখনও চলছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। কেন্দ্রীয় সরকার শুরু থেকেই জানিয়েছে, পুরো ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই প্রসঙ্গেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আগেই জানিয়েছিলেন, তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সিবিআই ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, আইনি কাঠামোও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র। প্রশ্নপত্র ফাঁসকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর শাস্তির বিধান, দ্রুত বিচার এবং পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির জবাবদিহি বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সম্প্রতি পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর বিষয়। এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, গত কয়েক মাসে তদন্তের ভিত্তিতে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রুখতে পরীক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের কাজও এগিয়ে চলছে।
শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, শুধু ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করলেই হবে না, পরীক্ষা পরিচালনার গোটা ব্যবস্থাকেই আধুনিক ও নিরাপদ করে তোলা প্রয়োজন। এনটিএ-তে সাম্প্রতিক রদবদল সেই বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এনটিএ পরিচালিত পরীক্ষাগুলির উপর। তাই এই সংস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এখন কেন্দ্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কঠোর জবাবদিহির মাধ্যমে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই কেন্দ্র এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।



