Home/India/নিজের লাইফজ্যাকেট খুলে বাঁচালেন বৃদ্ধকে, উদ্ধার অভিযানে প্রাণ হারালেন কেরলের ‘নায়ক’ রাজেশ
Advertisement
#16
Advertisement
#17
Advertisement
#18
Advertisement
#19
Advertisement
#20

নিজের লাইফজ্যাকেট খুলে বাঁচালেন বৃদ্ধকে, উদ্ধার অভিযানে প্রাণ হারালেন কেরলের ‘নায়ক’ রাজেশ

কেরলের ভয়াবহ বন্যার মধ্যে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন ৩৬ বছরের স্বেচ্ছাসেবক আর. রাজেশ। জীবন বাঁচানোর শেষ মুহূর্তেও নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবেননি তিনি। নদীর স্রোতে আটকে পড়া এক প্রবীণ কৃষককে নিজের লাইফজ্যাকেট পরিয়ে নিরাপদে পাঠানোর পরই প্রবল স্রোতে তলিয়ে যান রাজেশ। তিন দিন পর তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। অতীতেও কেরলের একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকাজে সামনের সারিতে থাকা এই যুবকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা রাজ্যে।

Joyjit Sengupta

Joyjit Sengupta

Author from Orange Prime News

Aug 6, 2026
5 min read
9
Share:
নিজের লাইফজ্যাকেট খুলে বাঁচালেন বৃদ্ধকে, উদ্ধার অভিযানে প্রাণ হারালেন কেরলের ‘নায়ক’ রাজেশ

কেরলের বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযানে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন স্বেচ্ছাসেবক আর. রাজেশ। ৩৬ বছর বয়সী এই যুবক প্রবল স্রোতের মধ্যে আটকে পড়া এক প্রবীণ কৃষককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিজেই নিখোঁজ হয়ে যান। দীর্ঘ তিন দিনের তল্লাশির পর তাঁর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল।

ঘটনাটি ঘটেছে কন্নুর জেলার বন্যাকবলিত একটি এলাকায়। টানা বর্ষণের জেরে নদীর জল বিপজ্জনকভাবে ফুলে ওঠে এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। সেই সময় একটি ছোট দ্বীপসদৃশ স্থানে ৬১ বছরের কৃষক বেন্নি আটকে পড়েছেন বলে খবর পান স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান রাজেশ এবং তাঁর দুই সহকর্মী শিবিন ও জিথিন।

স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে তিনজন নদী পার হয়ে ওই দ্বীপে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধ কৃষক আতঙ্কিত অবস্থায় আটকে রয়েছেন এবং নিজের পক্ষে নিরাপদ স্থানে ফেরা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজেশ প্রথমেই বৃদ্ধের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন।

উদ্ধারের সময় রাজেশ নিজের পরা লাইফজ্যাকেট খুলে বেন্নির গায়ে পরিয়ে দেন। এরপর নিরাপত্তার দড়ি ধরে সবাই নদীর তীরের দিকে ফিরছিলেন। কিন্তু তীব্র স্রোতের ধাক্কায় তীরের কাছাকাছি এসে রাজেশের হাত দড়ি থেকে ফসকে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি উত্তাল জলের স্রোতে ভেসে যান। সহকর্মীরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও প্রবল জলস্রোতের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বৃহৎ তল্লাশি অভিযান। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, দমকল এবং উদ্ধারকারী বাহিনী যৌথভাবে নদী ও আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। প্রায় তিন দিন পর অবশেষে রাজেশের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

জানা গিয়েছে, রাজেশ কেবল একজন স্বেচ্ছাসেবকই ছিলেন না, তিনি পেশাগতভাবে র্যাপেলিং প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন। তিরুঅনন্তপুরমের বাসিন্দা রাজেশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্যোগ মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিনথুল্লি জলপ্রপাত এলাকায় অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করতেন।

এটি তাঁর প্রথম উদ্ধার অভিযান ছিল না। ২০১৮ সালের ভয়াবহ কেরল বন্যার সময় অসংখ্য মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। পরে ২০২৪ সালের বিধ্বংসী ভূমিধসের সময়ও উদ্ধারকারী দলের সদস্য হিসেবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন সাহসী, নির্ভরযোগ্য এবং মানবিক এক স্বেচ্ছাসেবক।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রবল বর্ষণের ফলে নদীর জল হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কন্নুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ওই সময় নিজের কফি বাগানের অবস্থা দেখতে গিয়ে আটকে পড়েন প্রবীণ কৃষক বেন্নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, বাইরে বেরোনোর কোনও পথ তাঁর সামনে খোলা ছিল না। সেই খবর পেয়েই উদ্ধার অভিযানে নামে রাজেশদের দল।

উদ্ধার হওয়া বৃদ্ধ পরে জানান, রাজেশ যদি নিজের লাইফজ্যাকেট তাঁকে না দিতেন, তাহলে হয়তো তিনি জীবিত ফিরতে পারতেন না। নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে যেভাবে রাজেশ তাঁকে বাঁচিয়েছেন, তা তিনি কোনও দিন ভুলতে পারবেন না।

রাজেশের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী। এক বার্তায় তিনি বলেন, দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাজেশের মতো স্বেচ্ছাসেবকের অবদান রাজ্য কখনও ভুলবে না। তাঁর আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

রাজ্যের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও রাজেশকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মীরা প্রায়ই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু রাজেশ যেভাবে নিজের নিরাপত্তার সরঞ্জাম অন্যের হাতে তুলে দিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা বিরল দৃষ্টান্ত।

এই ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানের সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, অতিরিক্ত লাইফজ্যাকেট এবং আধুনিক উদ্ধার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য উন্নত নিরাপত্তা প্রোটোকলও প্রয়োজন।

কেরল বরাবরই বন্যা ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পাশাপাশি অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে নামেন। রাজেশ সেই দীর্ঘ তালিকারই এক উজ্জ্বল নাম, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন—মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে বড় দায়িত্ব তাঁর কাছে আর কিছু ছিল না।

আজ রাজেশ আর নেই। কিন্তু নিজের লাইফজ্যাকেট খুলে এক প্রবীণের জীবন রক্ষা করার সেই মুহূর্ত তাঁকে কেরলের মানুষের স্মৃতিতে চিরকাল এক নিঃস্বার্থ নায়ক হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবে।

Tags:India
Advertisement
#6
Advertisement
#7
Advertisement
#8
Advertisement
#9
Advertisement
#10