দেশে ফের বড়সড় বিমান দুর্ঘটনার খবর সামনে এল। এবার অসমের জোড়হাটে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি AN-32 পণ্যবাহী বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে জোড়হাট এয়ারবেসে নিরাপদে অবতরণের পরই আচমকা বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং বিমানটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই জোড়হাট এয়ারবেস এবং তার আশপাশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিমানটি মাটিতে নামার কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দ শোনা যায়। তারপরই বিমান থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন পুরো বিমানটিকে গ্রাস করে ফেলে।
প্রাথমিকভাবে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে জানা গিয়েছে, AN-32 মূলত ভারতীয় বায়ুসেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহণকারী বিমান। দীর্ঘদিন ধরেই এই বিমান সেনার রসদ, সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রাশিয়ার প্রযুক্তিতে নির্মিত এই টুইন-ইঞ্জিন বিমান বহু প্রতিকূল পরিবেশেও উড়ান পরিচালনায় সক্ষম বলে পরিচিত।
বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এয়ারবেসের জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে দ্রুত উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়েছে। বিমানটিতে থাকা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের প্রথম লক্ষ্য।
তবে দুর্ঘটনায় ঠিক কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা কোনও প্রাণহানি ঘটেছে কি না, সেই বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। যদিও প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, দুর্ঘটনাটি গুরুতর হওয়ায় হতাহতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিছু সূত্রে পাইলটের মৃত্যুর আশঙ্কার কথাও সামনে এসেছে, তবে বায়ুসেনা এখনও সেই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। বিমানটি নিরাপদে অবতরণের পর কীভাবে আগুন লাগল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিমানটিতে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না, ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিয়েছিল কি না অথবা জ্বালানি ব্যবস্থায় কোনও গোলযোগ তৈরি হয়েছিল কি না, সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখন বিমানটির ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা। কারণ ব্ল্যাক বক্সে থাকা তথ্য থেকেই দুর্ঘটনার ঠিক আগে বিমানের গতিবিধি, পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিগত অবস্থার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। সেই তথ্যই তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান অবতরণের পর আগুন লাগার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও তা অসম্ভব নয়। অনেক সময় ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি, ব্রেকিং সিস্টেমে সমস্যা, জ্বালানি লিক বা বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেও এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এই মুহূর্তে কোনও নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করতে নারাজ তদন্তকারীরা।
এই দুর্ঘটনার সময়টাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র এক দিন আগেই দেশে একটি বড় বিমান দুর্ঘটনার বর্ষপূর্তি পালিত হয়েছে। সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও বহু মানুষের মনে তাজা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির অনেকেই এখনও চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট এবং পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশে একাধিক বিমান দুর্ঘটনা ও জরুরি অবতরণের ঘটনা সামনে এসেছে। যদিও প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়, তবু বিমান নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক উড়ান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতীয় বায়ুসেনার পরিবহণ বহরে থাকা AN-32 বিমানগুলি বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত আপগ্রেড এবং নিরাপত্তা পর্যালোচনার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। যদিও জোড়হাটের এই দুর্ঘটনার সঙ্গে বিমানটির বয়স বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
এদিকে দুর্ঘটনার পর গোটা এয়ারবেস এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলের একাংশ ঘিরে রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসাবশেষ খতিয়ে দেখে সম্ভাব্য সব প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বায়ুসেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একটি বিস্তারিত তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ব্ল্যাক বক্সের তথ্য, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে পুরো ঘটনাক্রম পুনর্গঠন করার চেষ্টা করা হবে।
জোড়হাটের এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটিও কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর তদন্তের দিকে। কারণ, সেই রিপোর্টই জানাবে—নিরাপদ অবতরণের পরও কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে আগুনে ছারখার হয়ে গেল ভারতীয় বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ পণ্যবাহী AN-32 বিমান।



