সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগে লোকসভার অন্দরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলল। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠিত ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) এবার প্রথমবারের মতো লোকসভায় পৃথক সংসদীয় দল হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে দলের সাংসদরা আর আগের আসনে নয়, বরং আলাদা ব্লকে বসবেন বলে সূত্রের খবর।
সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠক করেন প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বৈঠকে সংসদে দলের স্বীকৃতি, সদস্যদের আসন বিন্যাস, সংসদীয় দপ্তর এবং নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অধিবেশন শুরুর আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতেই এই বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, লোকসভায় এনসিপিআইয়ের সংসদীয় দলনেতা হিসেবে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রায় চূড়ান্ত। দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং অতীতে বৃহৎ দলের নেতৃত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁর উপর এই দায়িত্ব অর্পণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের হাতে দলের মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হতে পারে। সংসদে দলের সদস্যদের উপস্থিতি, হুইপ জারি, ভোটাভুটি এবং সাংসদদের মধ্যে সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামলাবেন তিনি। অন্যদিকে, উপদলনেতার দায়িত্বে থাকতে পারেন বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। ফলে দলের সংসদীয় নেতৃত্বে তিনজন অভিজ্ঞ মুখকেই সামনে আনা হচ্ছে।
যদিও এই নিয়োগগুলির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও হয়নি, দলীয় বৈঠকের পরেই তা প্রকাশ্যে আসতে পারে। সূত্রের খবর, আগামী ১৯ জুলাই দলের সংসদীয় বৈঠকে প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেতৃত্বের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হবে।
এর পরদিন, অর্থাৎ ২০ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। তার আগে কেন্দ্রের ডাকা সর্বদল বৈঠকেও অংশ নেবে এনসিপিআই। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে দলের মতামতও তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতৃত্ব।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকের পর জানিয়েছেন, সংসদে দলের সাংগঠনিক ও সংসদীয় অধিকার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্পিকারের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন দল হিসেবে সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
লোকসভায় পৃথক আসন বরাদ্দের বিষয়টিও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সংসদে কোনও রাজনৈতিক দল নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নিয়ে স্বীকৃতি পেলে তাদের জন্য আলাদা আসন, কার্যালয় এবং সাংগঠনিক সুবিধা নির্ধারণ করা হয়। সেই নিয়ম মেনেই এনসিপিআইয়ের সাংসদদের জন্য পৃথক বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
দলের আসন কোন সারিতে হবে, কোন সাংসদ কোথায় বসবেন— সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্য দলীয় নেতৃত্ব এবং লোকসভা সচিবালয়ের আলোচনার ভিত্তিতেই নেওয়া হবে। যেহেতু এনসিপিআই এনডিএ-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই শাসক জোটের সদস্যদের কাছাকাছি আসন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।
বর্তমানে এনসিপিআইয়ের সঙ্গে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা ২০ জন লোকসভা সাংসদ। এই সংখ্যাই দলটিকে সংসদে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে। ফলে সংসদীয় কমিটি, আলোচনায় অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দলটি এখন নতুন সুযোগ পেতে চলেছে।
সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি সেরে ফেলতে চাইছে দল। বিভিন্ন বিল, জাতীয় ইস্যু এবং রাজ্য-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দলের অবস্থান নির্ধারণ করতে সাংসদদের মধ্যে একাধিক বৈঠকেরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংসদে সমন্বিত কৌশল নিয়েই নামতে চাইছে এনসিপিআই নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে পৃথক স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে দলটির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সংসদীয় পরিসরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগও মিলবে। বিশেষ করে নতুন দল হিসেবে সংসদে কার্যকর উপস্থিতি দেখাতে পারলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাদল অধিবেশনের আগে তাই শুধু সাংসদদের আসন বিন্যাস নয়, সংসদীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব বণ্টনও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০ জুলাই থেকে নতুন পরিচয়ে লোকসভার অধিবেশনে অংশ নেবে এনসিপিআইয়ের সংসদীয় দল।



