ইউপিআই ব্যবহারকারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। ডিজিটাল পেমেন্টের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে যে অতিরিক্ত চার্জের জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই পরিষ্কার করল কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থমন্ত্রকের বক্তব্য, সাধারণ ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউপিআই পরিষেবা আগের মতোই বিনামূল্যে থাকবে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি তাঁর বন্ধু, আত্মীয় বা অন্য কোনও ব্যক্তিকে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সেই লেনদেনের জন্য আলাদা করে মাশুল দিতে হবে না।
বিতর্কের সূত্রপাত সম্প্রতি লোকসভায় পাশ হওয়া ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭’-এর সংশোধনী ঘিরে। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে ইউপিআই-সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ও ব্যাঙ্কগুলির চার্জ কাঠামো নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ইউপিআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—তবে কি এবার থেকে প্রতিটি ইউপিআই লেনদেনের জন্য টাকা দিতে হবে?
শনিবার অর্থমন্ত্রকের তরফে দেওয়া ব্যাখ্যায় সেই আশঙ্কা অনেকটাই দূর করা হয়েছে। কেন্দ্র স্পষ্ট করেছে, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে হওয়া ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও নতুন চার্জ আরোপের পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ বর্তমানে যে পদ্ধতিতে একজন ব্যবহারকারী নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠান, সেই পরিষেবা বিনামূল্যেই চালু থাকবে।
তবে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে এখানেই শেষ নয়। কারণ, মার্চেন্ট বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চার্জ নিয়ে সরকারের বক্তব্য কিছুটা আলাদা। কেন্দ্র জানিয়েছে, মার্চেন্টদের সঙ্গে হওয়া ইউপিআই লেনদেনের সিংহভাগই বিনামূল্যে থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর চালু করা হয়, তা হলে নির্দিষ্ট সীমার বেশি কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে চার্জ আরোপের সুযোগ থাকতে পারে।
এখানে এমডিআর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট হল এমন একটি ফি, যা সাধারণত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেওয়া হয়। কার্ড পেমেন্টের ক্ষেত্রে এই ধরনের চার্জের প্রচলন রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ইউপিআইয়ের ক্ষেত্রেও এমন কোনও কাঠামো তৈরি করা হলে তা সব লেনদেনের উপর একসঙ্গে বসবে না বলেই জানিয়েছে কেন্দ্র।
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্ভাব্য চার্জের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে। সেই সীমার নিচে থাকা লেনদেনগুলি আগের মতোই বিনামূল্যে রাখার ব্যবস্থা থাকতে পারে। অর্থাৎ ছোট ব্যবসা বা সাধারণ গ্রাহকের দৈনন্দিন পেমেন্টের উপর নির্বিচারে মাশুল বসানোর কোনও পরিকল্পনার কথা কেন্দ্র জানায়নি।
আর যদি কোনও ক্ষেত্রে এমডিআর কার্যকর করা হয়, সেই চার্জের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম রাখা হবে বলে কেন্দ্রের বক্তব্য। সরকারের দাবি, এই সম্ভাব্য মাশুল ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে প্রচলিত এমডিআরের তুলনায় কম হতে পারে। ফলে ইউপিআই ব্যবহারের খরচ এক ধাক্কায় সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।
কেন এই সংশোধনীর প্রয়োজন হল, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছে কেন্দ্র। সরকারের মতে, ইউপিআই এখন দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এবং ব্যবসায়ী এই পরিষেবা ব্যবহার করেন। ফলে এই ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো উন্নত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য স্থায়ী আর্থিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইউপিআইয়ের জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, ততই প্রতারকদের লক্ষ্য হয়েছে এই প্ল্যাটফর্ম। ভুয়ো লিঙ্ক, প্রতারণামূলক কল, স্ক্রিন শেয়ারিং এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কৌশল ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। এই ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করছে কেন্দ্র।
সরকারের বক্তব্য, শুধুমাত্র সরকারি ভর্তুকির উপর নির্ভর করে ইউপিআইয়ের মতো বিশাল ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোকে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি কার্যকর রাজস্ব কাঠামো। সেই কারণেই সংশোধিত আইনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে চার্জ কাঠামো তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে বলে কেন্দ্রের দাবি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামী দিন থেকেই ইউপিআই ব্যবহারের জন্য সাধারণ মানুষকে টাকা দিতে হবে। বরং কেন্দ্রের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির লেনদেনের ক্ষেত্রে পরিষেবা বিনামূল্যেই থাকবে। মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ পেমেন্ট ফ্রি রাখার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন ইউপিআই ব্যবহারে এখনই কোনও পরিবর্তন আসছে না। দোকানে গিয়ে ছোটখাটো কেনাকাটা, বন্ধু বা আত্মীয়কে টাকা পাঠানো কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত পেমেন্টের ক্ষেত্রে কোনও নতুন মাশুল চালু হচ্ছে না বলেই কেন্দ্রের বক্তব্য।
তবে ব্যবসায়ীদের জন্য ভবিষ্যতের নিয়ম কিছুটা আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে চার্জ বসানোর সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সেই সীমা কত হবে, কোন ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেনে মাশুল প্রযোজ্য হবে এবং চার্জের হার কত রাখা হবে—এই বিষয়গুলি এখনও বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত হয়নি।
কেন্দ্রের যুক্তি, এই ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের নতুন রাস্তা খুলবে। পাশাপাশি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এর ফলে প্রযুক্তির উন্নয়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দ্রুততর পেমেন্ট পরিষেবা তৈরিতে সুবিধা হবে বলে মনে করছে সরকার।
ইউপিআই ইতিমধ্যেই ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। নগদ টাকার ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় সংস্থা—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল লেনদেনকে সহজ করেছে এই ব্যবস্থা। তাই ইউপিআইয়ের উপর নতুন করে কোনও চার্জ বসবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের শনিবারের বিবৃতি সেই উদ্বেগ অনেকটাই কমাল। আপাতত ব্যক্তিগত ইউপিআই লেনদেনে কোনও চার্জ নেই। মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ লেনদেন বিনামূল্যে রাখার কথা জানিয়েছে সরকার। ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সীমার বেশি কিছু ব্যবসায়িক লেনদেনে যদি এমডিআর চালু হয়, তবে সেটি সীমিত এবং তুলনামূলকভাবে কম হারে হওয়ার সম্ভাবনাই রয়েছে।
অর্থাৎ, ‘ইউপিআই ব্যবহার করলেই এবার থেকে টাকা দিতে হবে’—এমন কোনও সিদ্ধান্ত কেন্দ্র নেয়নি। বরং নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আর্থিকভাবে আরও টেকসই করার পথ তৈরি করা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, বাস্তবে মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও চার্জ কাঠামো তৈরি হয় কি না এবং হলে তার সীমা ও হার কী হয়।



