প্রায় ১০ বছর পর বিদেশ থেকে চিনি কেনার ভাবনা
চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো নয়, উৎপাদন উদ্বৃত্ত হলে ভারতীয় চিনি বিদেশের বাজারেও পাঠানো হয়। সেই ভারতকেই এবার উল্টো পথে হাঁটার কথা ভাবতে হচ্ছে।
দেশের বাজারে সরবরাহের ঘাটতি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা দামের জেরে বিদেশ থেকে চিনি আনার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
তবে এই সিদ্ধান্ত এখনও দেশের চিনি বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ভারত চিনি উৎপাদনে স্বনির্ভর থাকার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরবরাহ করে এসেছে।
এবার পরিস্থিতি উল্টে যাওয়ার পেছনে রয়েছে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার সমীকরণ।
ইথানল তৈরিতে আখের ব্যবহার বাড়াচ্ছে চাপ
চিনির বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসছে ইথানল উৎপাদন। পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গত কয়েক বছরে দেশে ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর উপর বিশেষ জোর দিয়েছে কেন্দ্র।
এর ফলে আখ থেকে তৈরি রস বা সিরাপের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন চিনির বদলে ইথানল তৈরির কাজে চলে যাচ্ছে। ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ আখের রস প্রয়োজন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইথানলের চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিও আখ সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কৃষকদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে আখ কেনার ফলে চিনি কলগুলির হাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কম পৌঁছচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিনি উৎপাদনে। অর্থাৎ একই আখের জোগান থেকে একদিকে ইথানলের জন্য কাঁচামাল যাচ্ছে, অন্যদিকে চিনি উৎপাদনের জন্য মিলগুলির হাতে আখের পরিমাণ কমছে।
ফলে বাজারে চিনির সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
অনিয়মিত বর্ষাও বাড়িয়েছে সমস্যা
শুধু ইথানল উৎপাদনই অবশ্য চিনির ঘাটতির জন্য দায়ী নয়। চলতি বছরে অনিয়মিত বর্ষার প্রভাবেও আখের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
আখ চাষের জন্য পর্যাপ্ত জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির ধরন বা পরিমাণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ফলনের উপর তার প্রভাব পড়ে। এবার সেই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইথানল উৎপাদনের বাড়তি চাহিদা।
ফলে চিনি কলগুলিতে আখের সরবরাহ কমেছে এবং উৎপাদনের পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের জনসংখ্যা এবং খাদ্যশিল্পের চাহিদার কারণে চিনির প্রয়োজন কমেনি। বরং উৎসবের মরশুম সামনে থাকায় আগামী কয়েক মাসে চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে এখন থেকেই সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করলে খুচরো বাজারে চিনির দাম আরও চড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে চিনি
উৎপাদন ও সরবরাহের এই চাপ ইতিমধ্যেই বাজারে দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে, দেশের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্রে, এক কুইন্টাল চিনির দাম ৫৪০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। চলতি মরশুমে এটিকে রেকর্ড দাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশজুড়ে পাইকারি বাজারে চিনির গড় দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫২.৩ টাকা। খুচরো বাজারে অবশ্য ক্রেতাদের আরও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
বিভিন্ন শহরে চিনির দাম ইতিমধ্যেই কেজিপ্রতি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে বলে খবর। অর্থাৎ পাইকারি ও খুচরো বাজারের ব্যবধানও যথেষ্ট।
এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরের খরচ বাড়াবে না। চিনিকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে এমন বহু খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে।
উৎসবের মরশুমে বাড়তে পারে চাপ
সামনে দুর্গাপুজো, দীপাবলির মতো বড় উৎসব। ভারতীয় বাজারে এই সময় মিষ্টি, মিষ্টিজাতীয় খাবার এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
বিশেষ করে মিষ্টি ব্যবসায়ীদের জন্য চিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। চিনির দাম যদি আরও বাড়ে, তাহলে উৎপাদন খরচ সামলাতে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের উপরও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মিষ্টি, বেকারি পণ্য, পানীয়-সহ চিনিনির্ভর বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়তে পারে।
তাই উৎসবের আগেই বাজারে পর্যাপ্ত চিনি পৌঁছে দেওয়া সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমদানির মাধ্যমে দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণ করার পরিকল্পনা সেই কারণেই বলে মনে করা হচ্ছে।
শুল্ক ছাড় দিয়ে আমদানির পরিকল্পনা
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১০ লক্ষ টন চিনি বিদেশ থেকে আনা হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই আমদানিতে শুল্ক না রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
আমদানির খরচ কম রাখলে বিদেশি চিনি দ্রুত দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। এর ফলে দেশীয় বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম বৃদ্ধির উপর চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করছে সরকার।
তবে এই পরিমাণ চিনি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা পুরোপুরি মিটবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক আমদানির ফলে কুইন্টালপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে পরবর্তী পর্যায়ে আরও চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়ছে ভারতের সিদ্ধান্তের প্রভাব
ভারত শুধু বিশ্বের অন্যতম বড় চিনি উৎপাদক নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট চিনির চাহিদার প্রায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ ভারতীয় রপ্তানির মাধ্যমে পূরণ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই ভারত যদি নিজেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চিনি কিনতে শুরু করে, তাহলে বিশ্ববাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই ব্রিটেন ও আমেরিকার বাজারে ভারতের সম্ভাব্য আমদানির খবর নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে।
ভারতের মতো বড় ক্রেতা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করলে বিশ্বব্যাপী চিনির দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যে দেশগুলি সাধারণত ভারতীয় চিনি আমদানি করে, তাদের সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
অর্থাৎ দেশের বাজারের ঘাটতি মেটাতে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ইথানল নীতি বনাম চিনির বাজার
বর্তমান পরিস্থিতি কেন্দ্রের ইথানল নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে নিয়ে এসেছে। জ্বালানিতে ইথানলের ব্যবহার বাড়ানোর ফলে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের জন্য আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু আখের একটি বড় অংশ ইথানল তৈরিতে চলে গেলে চিনি উৎপাদনের উপর চাপ পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি নীতি এবং খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারকে তাই একদিকে ইথানলের চাহিদা পূরণ করতে হবে, অন্যদিকে দেশের বাজারে চিনির পর্যাপ্ত জোগানও নিশ্চিত করতে হবে।
চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্য বজায় রাখার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আগামী মরশুমে আখ উৎপাদন, ইথানলের চাহিদা এবং চিনির বাজার পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয়ই ঠিক করবে ভারত আবার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই থাকবে, নাকি আমদানির প্রয়োজন আরও বাড়বে।



