হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনার পর কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারত সরকার। ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার দিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের ডেপুটি চিফ অব মিশন মহম্মদ জাভেদ হোসেইনিকে তলব করেছে বিদেশমন্ত্রক। হামলার কারণ, পরিস্থিতি এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের অবস্থান জানতে চাওয়া হবে বলে সরকারি সূত্রে খবর।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের আবহে এই হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট। এখান দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও পণ্য পরিবহণ হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতি ও জাহাজ চলাচলের উপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ওমান উপকূলের কাছে 'মোম্বাসা' এবং 'আল বাহিয়া' নামে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার মুখে পড়ে। হামলায় মোট আটজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় নাবিক বলে জানা গিয়েছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে একজন পরে মারা যান। আরও চারজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও এক ভারতীয় নাবিককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছে।
ভারত সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আহত ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে বিদেশমন্ত্রক।
হামলার পর ইরানের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা সামুদ্রিক নিরাপত্তার পরিপন্থী। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে আবু ধাবি।
ভারতের কূটনৈতিক পদক্ষেপকে এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। বিদেশমন্ত্রকের তরফে ইরানি কূটনীতিককে ডেকে পাঠিয়ে হামলার ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক নৌপথে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস করা হবে না বলেই সরকারি মহলের ইঙ্গিত।
এদিকে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত আরও জটিল আকার নিচ্ছে। মঙ্গলবার ভোরে ইরানের একাধিক স্থানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। টানা তিন দিন ধরে চলা এই অভিযানের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরানি জাহাজের উপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে ওই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলির উপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
এই ঘোষণার পর থেকেই উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহণ হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘর্ষ শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের উপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর জেরে তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পশ্চিম এশিয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজে বহু ভারতীয় কর্মরত থাকেন। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, চলমান সংঘাতের মধ্যে ইতিমধ্যেই একাধিক ভারতীয় নাবিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিভিন্ন জাহাজে হামলার ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলিকে সতর্ক রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলও দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। কারণ হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও বড়সড় অভিঘাত পড়তে পারে।
ভারত আপাতত কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ইরানের কাছ থেকে ঘটনার পূর্ণ ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতীয় নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতির উপর নজর রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে বিদেশমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে।



