শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আবারও নিয়োগ প্রক্রিয়ার দায়িত্বে রাখা হয়েছে— এই তথ্য সামনে আসার পর কলকাতা হাই কোর্টে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি অমৃতা সিনহা প্রশ্ন তোলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং যাঁদের নাম তদন্তকারী সংস্থার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাঁরা কীভাবে নতুন নিয়োগের মতো সংবেদনশীল দায়িত্বে বহাল থাকেন।
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্কুল সার্ভিস কমিশনের দুই কর্মী— একজন সিস্টেম ম্যানেজার এবং অন্যজন ফ্লোর ম্যানেজার। ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে সিবিআইয়ের দাখিল করা চার্জশিটে তাঁদের নাম রয়েছে। সেই কারণেই তাঁদের ভূমিকা নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ২০২৫ সালের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বলে আদালতে জানানো হয়।
এই তথ্য সামনে আসার পর বিচারপতি সিনহা বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁদের দায়িত্ব থেকে কেন আগেই সরানো হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেখানে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি গোটা ব্যবস্থার উপর নতুন করে প্রশ্ন তুলে দেয়।
সূত্রের খবর, সম্প্রতি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বিষয়টি খতিয়ে দেখে ওই দুই কর্মীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশের পর স্কুল সার্ভিস কমিশন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অবিলম্বে দায়িত্ব হস্তান্তর করার নোটিস দেয়। কিন্তু অভিযোগ, নির্দেশ জারি হলেও দুই কর্মী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দায়িত্ব ছাড়েননি।
এরপরই তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালতে তাঁদের তরফে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হলেও বিচারপতি সিনহা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিদের প্রশাসনিক দায়িত্বে রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কমিশনের পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শুনানির সময় বিচারপতি মন্তব্য করেন, দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে স্কুল সার্ভিস কমিশনের উচিত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা। যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন তিনি। আদালতের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে প্রশাসনের সক্রিয় পদক্ষেপ অপরিহার্য।
একই সঙ্গে আদালত জানিয়ে দেয়, বিধি মেনে শিক্ষা দপ্তরও এই দুই কর্মীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, কমিশনের অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের পাশাপাশি শিক্ষা দপ্তরেরও আইনগতভাবে হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে গত কয়েক বছর ধরে অন্যতম বড় বিতর্কের বিষয়। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। তদন্তে উঠে আসে নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব, নম্বর পরিবর্তন, অস্বচ্ছ প্যানেল তৈরির মতো নানা অনিয়মের অভিযোগ। পরবর্তী সময়ে সিবিআই তদন্ত শুরু হলে একাধিক ব্যক্তি ও আধিকারিকের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার সময় প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। চাকরিপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। সেই প্রেক্ষাপটে পুরনো দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আবার দায়িত্বে রাখার বিষয়টি নিয়ে আদালতের উদ্বেগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে আইনজ্ঞ মহল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিংবা অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ এবং অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ সেই বৃহত্তর উদ্বেগকেই সামনে এনে দিয়েছে। আদালত মূলত এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নাতীত হওয়া প্রয়োজন।
এখন নজর স্কুল সার্ভিস কমিশন ও শিক্ষা দপ্তরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আদালতের নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট দুই কর্মী আদৌ দায়িত্ব হস্তান্তর করেন কি না এবং তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। তবে এই শুনানির পর শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক যে আরও জোরালো হবে, তা নিয়ে সংশয় নেই।



