দীর্ঘ প্রায় দু’মাস ধরে দেশের অন্যতম আলোচিত ইস্যু ছিল নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা, নতুন করে পরীক্ষা আয়োজন, তদন্ত এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদের আবহের মধ্যেই অবশেষে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মঙ্গলবার এনডিএ-র সংসদীয় বৈঠকে তিনি প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে ‘ঘোর পাপ’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি সামনে আসার পরই কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। তদন্ত শুরু হয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার এবং সেই দায়িত্ব পালনে কোনওরকম গাফিলতি করা হবে না।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যেই এই মামলায় একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৩ জন অভিযুক্ত বর্তমানে জেলের হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দলগুলিকে এই ইস্যুতে অতিরিক্ত রাজনীতি না করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে সমস্যার সমাধানই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কেন্দ্রীয় সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজুও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি কমাতেই পুনরায় পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের দাবি, গোটা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করার জন্য ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
তবে বিরোধীদের মতে, এই মন্তব্য অনেক দেরিতে এসেছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ঘটনার গুরুত্ব সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় নীরব থেকেছেন। সেই নীরবতার কারণ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। অবশেষে তিনি মুখ খুললেও, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দায় বা তাঁর পদে থাকা নিয়ে কোনও স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী শুরু থেকেই এই ইস্যুতে কেন্দ্রকে আক্রমণ করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলেও তার স্থায়ী সমাধানে কেন্দ্র ব্যর্থ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, অতীতেও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় জবাবদিহি হয়নি। একই ধরনের ঘটনা ফের ঘটায় সরকারের দায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি কেন এখনও শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন কংগ্রেস নেতা।
এই ইস্যু ঘিরে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্কই নয়, রাস্তায় নেমেছেন বহু পরীক্ষার্থী এবং ছাত্র সংগঠনের সদস্যরাও। বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ, মিছিল এবং অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা পুনরায় স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থার দাবি তুলেছেন। অভিযোগ, প্রশ্নফাঁসের কারণে বহু মেধাবী পরীক্ষার্থীর পরিশ্রম বিফলে গিয়েছে এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও তাঁর আন্দোলন এখনও জাতীয় স্তরে আলোচনার বিষয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধুমাত্র তদন্ত নয়, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে তার জন্য পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা শুধু একটি পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, গোটা নিয়োগ ও ভর্তি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে। তাই শুধুমাত্র অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ, পরিবহণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে আরও কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
এদিকে কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আরও প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হবে। তবে বিরোধীরা মনে করছে, শুধু আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। পরীক্ষার্থীদের আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দায় নির্ধারণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যে কেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট হলেও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও থামেনি। প্রশ্নফাঁসকে ‘ঘোর পাপ’ বলে নিন্দা জানানো হলেও, দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কী কী বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেই দিকেই এখন নজর দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের।



