মহারাষ্ট্রে ফের রাজনৈতিক ভূমিকম্পের আশঙ্কা
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সূত্রের দাবি, উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি)-র একাধিক সাংসদ শিবসেনার শিন্দে শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এই পরিস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা উস্কে দিয়েছে।
লোকসভায় উদ্ধব শিবিরের মোট সাংসদ সংখ্যা বর্তমানে নয়। রাজনৈতিক মহলের হিসাব বলছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয় জন যদি একযোগে দলত্যাগ করেন, তাহলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। কারণ, সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী কোনও আইনসভার দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একত্রে দল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তা ‘বিভাজন’ বা ‘মার্জার’-এর বিশেষ ক্ষেত্রে বিবেচিত হতে পারে।
সূত্রের খবর, দিল্লিতে শিন্দে শিবিরের সঙ্গে উদ্ধবপন্থী কয়েকজন সাংসদের আলোচনা হয়েছে। আরও কয়েকজন সাংসদের নামও এই সম্ভাব্য বিদ্রোহী তালিকায় উঠে আসছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি।
উদ্ধব শিবিরের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
রাজনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, যাঁদের নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না উদ্ধব শিবিরের নেতারা। ফলে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই উদ্ধব অনুগত সাংসদরা লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের আবেদন, যদি কোনও পৃথক গোষ্ঠী নিজেদের আলাদা শিবির হিসেবে দাবি করে, তাহলে তা যেন তড়িঘড়ি স্বীকৃতি না পায়।
অন্যদিকে, উদ্ধব শিবিরের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে সাংসদদের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের কোনও স্বাধীন প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
শিন্দে-উদ্ধব দ্বন্দ্বের দীর্ঘ ইতিহাস
মহারাষ্ট্রে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন নতুন নয়। ২০২২ সালে একনাথ শিন্দে শিবসেনার একাধিক বিধায়ককে নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পরই রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে যায়।
তখনকার মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরবর্তীতে বিজেপির সমর্থনে নতুন সরকার গঠন করেন শিন্দে। এরপর শরদ পওয়ারের দল এনসিপিতেও ভাঙন দেখা দেয় এবং অজিত পওয়ার নিজের গোষ্ঠীকে নিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায় হতে পারে লোকসভায় উদ্ধবসেনার সম্ভাব্য ভাঙন।
উত্তরপ্রদেশেও নতুন সমীকরণের গুঞ্জন
শুধু মহারাষ্ট্র নয়, উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তার আবহ। সমাজবাদী পার্টির অন্দরে অসন্তোষ রয়েছে এবং দলটির একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকছে বলে দাবি করেছেন উত্তরপ্রদেশ সরকারের মন্ত্রী ও সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওমপ্রকাশ রাজভর।
তাঁর বক্তব্য, সমাজবাদী পার্টির বহু নেতা এবং জনপ্রতিনিধি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, দলের মধ্যে বড় ধরনের ভাঙনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এই সমস্ত দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব।
অখিলেশের বার্তা, ‘ভয় পেলে চলে যাবেন’
দল ভাঙার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের মুখে অখিলেশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজবাদী পার্টি এখনও সংগঠিত এবং শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে তাঁদের দল থেকে নেতারা অন্য দলে গিয়েছেন, কিন্তু তাতে সংগঠন দুর্বল হয়নি। বরং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যেতে গেলে সাহসী এবং আদর্শে অনড় কর্মী-নেতাদের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, অখিলেশের এই মন্তব্যের মধ্যে একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাসের বার্তা রয়েছে, তেমনই সম্ভাব্য দলবদলের ইঙ্গিতও পরোক্ষে স্বীকার করা হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ বিধান?
বর্তমান রাজনৈতিক জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন।
এই আইনের মূল উদ্দেশ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্বিচারে দল পরিবর্তন রোধ করা। কিন্তু সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রয়েছে।
কোনও আইনসভা দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একযোগে অন্য দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে, তা সাধারণ দলত্যাগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। ফলে সংশ্লিষ্ট সাংসদ বা বিধায়কদের সদস্যপদ খারিজ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধানই বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে বড় ভূমিকা পালন করছে।
দল ভাঙলে প্রতীক ও তহবিলের কী হয়?
রাজনৈতিক দল ভেঙে গেলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— দলের প্রতীক, নাম এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও দলের সংসদীয় অংশ এবং সাংগঠনিক অংশ— এই দুইয়ের মধ্যে কে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তা খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রয়োজনে কমিশন সাময়িকভাবে দুই গোষ্ঠীকেই পৃথক প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভাঙনের সময়ে এমন নজির দেখা গিয়েছে।
বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ মনে করছে, আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে সংসদে সংখ্যা বৃদ্ধি করা কেন্দ্রীয় শাসক দলের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য হতে পারে।
তাঁদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বা বড় রাজনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে। সেই কারণেই বিভিন্ন বিরোধী শিবিরে ভাঙনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
যদিও শাসক শিবিরের তরফে এই অভিযোগের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
এ মুহূর্তে মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশ— দুই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরই নজর রয়েছে দেশের রাজনৈতিক মহলের। কারণ, দুই-তৃতীয়াংশের অঙ্ক মিললে শুধু কয়েকজন সাংসদের দলবদলই নয়, বদলে যেতে পারে আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির সমীকরণও।



