দলবদল করা ২০ সাংসদকে নোটিস
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ফল খারাপ হওয়ার পর দলের একাধিক সাংসদ দল ছাড়েন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-তে যোগ দেন বলে দাবি করা হয়েছে। নতুন দলে যোগ দেওয়ার পর তাঁরা এনডিএ সরকারকে সমর্থনের কথা জানান।
সংসদে তাঁদের আসনও বদল করা হয়। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়-সহ দলবদলকারী সাংসদরা নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আসন পরিবর্তন করেন।
তবে তাঁদের এনসিপিআই সাংসদ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে দাবি তৃণমূলের। এই পরিস্থিতিতেই দলবদল করা সাংসদদের সদস্যপদ খারিজের দাবি সামনে আসে।
অভিষেকের আবেদনে শুরু আইনি লড়াই
বাদল অধিবেশন চলাকালীন তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর আবেদনের মূল বিষয় ছিল, তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে পরে এনসিপিআইতে যোগ দেওয়া ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়া।
অভিষেক এই বিষয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকেও চিঠি দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, দলবদলকারী সাংসদদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক ও আইনগত বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিষয়টি ওঠে। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনাও।
অভিষেকের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন তৃণমূল সাংসদ তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা।
স্পিকারের পদক্ষেপের কথা আদালতে জানালেন সলিসিটর জেনারেল
শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের ভিত্তিতে লোকসভার স্পিকার ইতিমধ্যেই প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় সদস্যপদ খারিজের আবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্য জানতে তাঁদের আলাদা করে নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়।
জানা গিয়েছে, ২০ জন সাংসদকেই জবাব দেওয়ার জন্য সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন প্রত্যেক সাংসদকে তাঁদের দলবদলের পরিস্থিতি এবং সদস্যপদ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য স্পিকারের কাছে জানাতে হবে।
এই জবাবের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম কোর্টেও সব পক্ষকে নোটিস
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টও মামলায় সব পক্ষকে নোটিস জারি করেছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার-সহ ২০ জন দলবদলকারী সাংসদকে সেই নোটিস দেওয়া হয়েছে।
মামলার পরবর্তী শুনানি দুই সপ্তাহ পরে হওয়ার কথা। ফলে একদিকে স্পিকারের সামনে সাংসদদের জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টেও বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।
দুই জায়গার আইনি প্রক্রিয়াই এখন একইসঙ্গে এগোচ্ছে। ফলে ২০ সাংসদের সদস্যপদ নিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কী বলছে দলত্যাগ বিরোধী আইন?
ভারতের সংবিধানের দশম তফসিলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধান রয়েছে। কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দল পরিবর্তন করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে।
তবে দলত্যাগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন রয়েছে। কোনও সাংসদ ব্যক্তিগতভাবে দল ছেড়েছেন, নাকি নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য একসঙ্গে দল পরিবর্তন করেছেন, তাঁদের নতুন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক কী এবং মূল দলের সাংগঠনিক অবস্থান কী—এসব বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
এই কারণেই ২০ সাংসদের ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পিকারের কাছে তাঁরা কী যুক্তি দেন, তার উপর পরবর্তী প্রক্রিয়ার গতিপথ নির্ভর করতে পারে।
তৃণমূলের আক্রমণ মহুয়া মৈত্রের
এই ঘটনায় তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও সরব হয়েছেন। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি দাবি করেন, দলবদলকারী ২০ সাংসদের সদস্যপদ বাতিলের জন্য তৃণমূল আগেই আবেদন করেছিল।
মহুয়ার দাবি, গত ১৯ জুন তাঁরা ২০টি আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এতদিন সেই আবেদনের বিষয়ে স্পিকারের দফতর থেকে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।
তাঁর আরও দাবি, আদালতে সলিসিটর জেনারেল যখন স্পিকার নোটিস জারি করেছেন বলে জানান, তখন দেখা যায় নোটিসটির তারিখ ২৫ আগস্ট। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির দিনই সেটি জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এই নিয়ে স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ।
এনসিপিআই সাংসদদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
২০ সাংসদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁদের জবাব। তাঁরা কেন তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইতে যোগ দিয়েছেন এবং সেই দলবদলের ক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোনও বিধান প্রযোজ্য কি না—এই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের দিতে হতে পারে।
স্পিকারের কাছে দেওয়া বক্তব্যের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের মামলাতেও তাঁদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
যদি স্পিকার তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাঁদের লোকসভার সদস্যপদ নিয়ে বড় ধরনের সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। আবার সাংসদদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে স্পিকার অন্য সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
তাই এই মুহূর্তে সদস্যপদ খারিজ হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কয়েকটি ধাপ বাকি রয়েছে।
রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব পড়তে পারে
২০ সাংসদের সদস্যপদ নিয়ে টানাপোড়েনের রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। কারণ দলবদলকারী সাংসদরা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এনডিএকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ফলে তাঁদের সদস্যপদ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হলে সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের কাছে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ দল ছেড়ে যাওয়া সাংসদদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ফলে আদালতের আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি বিষয়টি দুই রাজনৈতিক শিবিরের সংঘাতেরও অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এখন নজর স্পিকার ও সুপ্রিম কোর্টের দিকে
এই মুহূর্তে ২০ সাংসদের সদস্যপদ খারিজ হয়নি। তবে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পিকারের নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য সাত দিনের সময়সীমা এবং সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানি—দুই দিকেই এখন নজর থাকবে।
সাংসদদের বক্তব্য পাওয়ার পর স্পিকার কী সিদ্ধান্ত নেন এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি কোন দিকে এগোয়, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দলবদল বিরোধী আইনের ব্যাখ্যা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সদস্যপদ নিয়ে এই মামলার ফল ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।



