দিল্লির রাজনীতিতে ফের অস্বস্তিতে আম আদমি পার্টি। দিল্লির প্রাক্তন জলসম্পদ মন্ত্রী তথা আপ নেতা সত্যেন্দ্র জৈনকে নতুন একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করল দিল্লি পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা। দিল্লি জল বোর্ডের নর্দমা শোধন কেন্দ্রগুলির আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগে এই পদক্ষেপ।
তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, টেন্ডারের শর্তাবলীতে ইচ্ছাকৃত ভাবে পরিবর্তন এবং একাধিক পক্ষের মধ্যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১.৫২ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ। মামলায় সত্যেন্দ্র জৈন ছাড়াও আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই কারচুপির অভিযোগ
দিল্লি দুর্নীতি দমন শাখার তরফে মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দিল্লি জল বোর্ডের অধীনে থাকা একাধিক সিওয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা নর্দমা শোধন কেন্দ্রের আধুনিকীকরণের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। সেই দরপত্রের শর্ত তৈরি ও বরাত দেওয়ার প্রক্রিয়াতেই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে টেন্ডারের নিয়মে কারচুপি করা হয়েছিল। শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, এর পিছনে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রও ছিল বলে অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার।
এই ঘটনায় দিল্লি সরকারের ভিজিল্যান্স ডিরেক্টরেটের তরফে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোয়। তদন্তের পর একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগ সামনে আসে।
সত্যেন্দ্র জৈন ছাড়াও গ্রেপ্তার আরও পাঁচ
এই মামলায় মোট ছ’জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন শাখা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দিল্লির প্রাক্তন মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন এবং দিল্লি জল বোর্ডের প্রাক্তন সিইও তথা আইএএস আধিকারিক উদিত প্রকাশ রাই।
গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রাক্তন চুক্তিভিত্তিক পরামর্শদাতা অঙ্কিত শ্রীবাস্তবকেও। পাশাপাশি টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার কর্ণধারদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
তদন্তকারীদের তালিকায় রয়েছেন ‘এএন এন্টারপ্রাইজেস’-এর মালিক নগেন্দ্র যাদব, ‘ইউরোটেক এনভায়রনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মালিক রাজা কুমার কুররা এবং ‘সৃজনহার’-এর মালিক পঙ্কজ ভার্মা।
সরকারি আধিকারিক থেকে বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের এই তালিকায় থাকা থেকেই তদন্তকারীরা মনে করছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরে সমন্বয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১.৫২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সংশ্লিষ্ট টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রায় ১.৫২ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
তবে এই অর্থ কীভাবে সরানো হয়েছিল, কারা সরাসরি লাভবান হয়েছেন এবং টেন্ডারের কোন পর্যায়ে সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।
টেন্ডারের শর্ত তৈরির সময় থেকেই কারচুপি হয়েছিল কি না, নাকি পরে বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে—সেটিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক ও বেসরকারি সংস্থাগুলির মধ্যে আর্থিক বা অন্য কোনও ধরনের যোগাযোগ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও জেলে গিয়েছেন সত্যেন্দ্র জৈন
সত্যেন্দ্র জৈনের বিরুদ্ধে এই প্রথম দুর্নীতির অভিযোগ উঠল, এমন নয়। আর্থিক তছরুপের একটি মামলায় এর আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ওই মামলায় প্রায় ১৮ মাস জেলবন্দি ছিলেন তিনি।
ফলে নতুন করে গ্রেপ্তারের ঘটনা আপ নেতার রাজনৈতিক জীবনে আরও চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তিনি দিল্লি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকার সময় যে সমস্ত সরকারি প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেগুলি নিয়ে তদন্তকারী সংস্থার নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে কোনও মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে তদন্তকারী সংস্থাকে তাদের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত দায় নির্ধারিত হবে।
আপের দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তিতে ফের প্রশ্ন
আম আদমি পার্টির রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। দিল্লির রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত দলগুলির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নতুন রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছিল আপ।
দলের প্রতীক ঝাড়ুকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচ্ছন্নতার প্রতীক হিসেবেই সামনে এনেছিলেন নেতৃত্ব। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের দুর্নীতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও ছিল দলের রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তদন্ত শুরু হওয়ায় সেই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই বিরোধীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে আপকে।
মণীশ সিসোদিয়ার পর এবার ফের জৈন
আপের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়াকেও দুর্নীতির মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। আবগারি নীতি সংক্রান্ত মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন তিনি।
সত্যেন্দ্র জৈনের বিরুদ্ধেও আগে আর্থিক তছরুপের মামলা হয়েছিল। ফলে একই দলের একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত রাজনৈতিক ভাবে আপের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার দিল্লি জল বোর্ডের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে নতুন অভিযোগ সামনে আসায় বিরোধীরা আপ নেতৃত্বকে নিশানা করার আরও একটি সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জল বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলি খতিয়ে দেখার সম্ভাবনা
জল সরবরাহ, নর্দমা ব্যবস্থাপনা এবং সিওয়েজ ট্রিটমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দিল্লি জল বোর্ড। ফলে এই সংস্থার কোনও প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শুধু সরকারি অর্থের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
টেন্ডারের মাধ্যমে কোন সংস্থা কাজ পেয়েছিল, প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় কত ছিল, কাজের বাস্তব অগ্রগতি কতটা এবং বরাত দেওয়ার সময় নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হতে পারে।
তদন্তে যদি আরও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে তদন্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এখন নজর তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপে
সত্যেন্দ্র জৈন-সহ ছ’জনকে গ্রেপ্তারের পর এখন তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই নজর। তদন্তকারী সংস্থা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি নথি, টেন্ডারের শর্ত, বরাত সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এই মামলায় আদালতের পরবর্তী শুনানিও গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।
সত্যেন্দ্র জৈনের নতুন করে গ্রেপ্তার তাই শুধু একটি টেন্ডার দুর্নীতির মামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে দিল্লি জল বোর্ডের কাজকর্ম, সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আম আদমি পার্টির দুর্নীতিবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নও।



