ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথে ফের চাকা ঘুরল
শনিবার পূর্ব সিকিমের নাথু-লা গিরিপথে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত বাণিজ্যের সূচনা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারত ও চিন—উভয় দেশের প্রশাসনিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর এই বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু হওয়াকে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতীয় পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন সিকিমের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী টি টি ভুটিয়া। তিনি জানান, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়া শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, গোটা রাজ্যের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু পরিবার এই বাণিজ্যের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।
১৯৬২ সালের যুদ্ধ থেকে মহামারি—দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী নাথু-লা
নাথু-লা শুধু একটি সীমান্ত গিরিপথ নয়, এটি ভারত-চিন বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর কয়েক দশক এই পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল। প্রায় ৪৪ বছর পরে, ২০০৬ সালে দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে পুনরায় সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর সফলভাবে বাণিজ্য চললেও ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই থেকে প্রায় ছয় বছর ধরে এই রুটে কোনও বাণিজ্যিক কার্যক্রম হয়নি। অবশেষে চলতি বছরে আবার সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটল।
প্রাচীন সিল্ক রুটের ঐতিহ্য বহন করছে এই গিরিপথ
নাথু-লা বহু শতাব্দী ধরে ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিব্বতের লাসা থেকে চুম্বি উপত্যকা হয়ে এই পথ পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করত। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের তমলুক, প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দর পর্যন্ত এই বাণিজ্যপথের বিস্তার ছিল বলে ইতিহাসবিদদের মত।
এই রুট দিয়েই অতীতে কাঁচা রেশম, পশম, ইয়াকের লোম, মাটির তৈরি হস্তশিল্পসহ একাধিক পণ্য দুই অঞ্চলের মধ্যে আদানপ্রদান হত। আধুনিক সময়েও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই সীমান্ত বাণিজ্য পরিচালিত হয়।
নভেম্বর পর্যন্ত চলবে বাণিজ্য
সিকিম সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প দপ্তরের সচিব কর্মা ডোমা ইউতসো জানিয়েছেন, চলতি মরশুমে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সীমান্ত বাণিজ্য চালু থাকবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি পাবে। প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৬০টি মালবাহী যান চলাচলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রতি বছর সাধারণত মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এই গিরিপথে বাণিজ্য পরিচালিত হয়। শীতকালে প্রবল তুষারপাতের কারণে পথটি বন্ধ রাখতে হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উৎসাহ
নাথু-লা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হওয়ায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে। নাথু-লা বর্ডার ট্রেডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অনিল কুমার গুপ্ত জানান, মহামারির আগে প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী এই সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবারও প্রায় একই সংখ্যক ব্যবসায়ীকে অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নতুন করে বাণিজ্য শুরু হওয়ায় সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
প্রায় ৫০০ ব্যবসায়ী সরাসরি উপকৃত হবেন
সিকিম সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ার ফলে প্রায় ৫০০ ব্যবসায়ী প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। পাশাপাশি পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, হোটেল, পর্যটন, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি সচল রাখতে এই বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পণ্যের আদানপ্রদান নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা।
কূটনৈতিক আলোচনার ফলেই পথ খুলল
নাথু-লা পুনরায় চালু হওয়ার পিছনে গত কয়েক মাস ধরে ভারত ও চিনের মধ্যে চলা কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়। সেই বৈঠকে নাথু-লার পাশাপাশি হিমাচল প্রদেশের শিপকি-লা এবং উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ গিরিপথ নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
এরপর চলতি বছরের জুলাই মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির চিন সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, সীমান্ত অবকাঠামো এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেই বৈঠকের পর থেকেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
শুধু বাণিজ্য নয়, পর্যটনেও নতুন সম্ভাবনা
নাথু-লা ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চ পার্বত্য পর্যটন কেন্দ্র। সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হলে ওই অঞ্চলে পর্যটকদের আগ্রহও আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় হোটেল, পরিবহণ, গাইড পরিষেবা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন গতি আসবে।
একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধিতেও এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রশাসনের আশা।
ছয় বছর পর নাথু-লা বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু হওয়ায় ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা গেল বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর যে প্রচেষ্টা দুই দেশ চালাচ্ছে, নাথু-লার পুনরুজ্জীবন সেই উদ্যোগেরই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে ধরা হচ্ছে।



