অসমে বন্যার ভয়াবহতা এখনও কাটেনি। টানা বৃষ্টির জেরে রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যাওয়ার পর কয়েক দিন কেটে গেলেও বহু মানুষ এখনও ঘরছাড়া। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। গোলাঘাট এবং কার্বি আংলং জেলায় একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। এর ফলে চলতি বন্যায় অসমে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০০-তে পৌঁছেছে।
বর্তমানে রাজ্যের একাধিক জেলায় বন্যার প্রভাব রয়েছে। চরাইদেও, দারাং, গোলাঘাট, জোড়হাট, কার্বি আংলং, নগাঁও এবং শিবসাগর—এই সাত জেলায় সব মিলিয়ে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০০-রও বেশি মানুষ দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ বিপাকে পড়েছেন গোলাঘাটে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই জেলায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বন্যার কবলে রয়েছেন। শিবসাগরে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার এবং জোড়হাটে প্রায় ১৬ হাজার।
গত শনিবারের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তার ফলে কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তবে সেই স্বস্তি এখনও সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার মতো নয়। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জল জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত। অনেক পরিবার এখনও নিরাপদ আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে।
বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ছয়টি জেলায় মোট ১২৫টি ত্রাণশিবির এবং ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪৯ হাজার ৬১ জন মানুষ এই শিবিরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের জন্য খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের কাজ চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যাকবলিত এলাকায় বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক দিনের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে ৭১০.৪৪ কুইন্টাল চাল, ১২৭.৮৫ কুইন্টাল ডাল, ৩৮.৩৪ কুইন্টাল লবণ এবং ৩,৭৭৩.৭ লিটার সরষের তেল বিতরণ করা হয়েছে। দুর্গত মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে এই সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে এত বড় সংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে ত্রাণ দেওয়া প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু মানুষের বসতিই নয়, বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে কৃষিক্ষেত্রেও। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও ৪৫৬টি গ্রাম প্লাবিত। প্রায় ১১,৯৩৩.৪৬ হেক্টর কৃষিজমি জলের নিচে রয়েছে। ফলে ধান-সহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষের কাছে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের। বন্যার জল দ্রুত না নামলে চলতি মরশুমের কৃষিকাজে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বন্যার জলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিকাঠামোও। বিভিন্ন জেলার বাঁধ, রাস্তা এবং সেতুর উপর প্রভাব পড়েছে। কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার জলমগ্ন রাস্তার কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। দুর্গত এলাকাগুলিতে প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।
নদীর জলস্তর নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গোলাঘাট ও নুমালিগড় এলাকায় ধানসিঁড়ি নদী এবং শ্রীভূমিতে কুশিয়ারা নদী এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। নদীগুলির জলস্তর স্বাভাবিক না হলে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বৃষ্টিপাত কমলেও উজান থেকে জল নামার ফলে নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যার প্রভাব পড়েছে পশুপালনেও। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ৪৩,৩৩১টি গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগির মৃত্যু হয়েছে। কৃষিজমির ক্ষতির পাশাপাশি গবাদি পশুর মৃত্যু গ্রামীণ অর্থনীতির উপরও চাপ বাড়াচ্ছে। বহু পরিবার কৃষিকাজ ও পশুপালনের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
অসমে প্রতি বছরই বর্ষার সময়ে বন্যা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এ বারের পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছুঁয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একদিকে মানুষের প্রাণহানি, অন্যদিকে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তা, সেতু এবং পশুপালনের ক্ষতি—সব মিলিয়ে বিপর্যয়ের বহুমাত্রিক চেহারা সামনে এসেছে।
প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য দুর্গত মানুষকে নিরাপদে রাখা এবং তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে নদীর জলস্তর এবং বাঁধগুলির পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। বৃষ্টি আরও কমলে ধীরে ধীরে প্লাবিত এলাকা থেকে জল নামার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জল সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
এই পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পুনর্বাসনও বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ঘরবাড়ি এবং চাষের জমির ক্ষতি হওয়ায় বহু পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে। বন্যার জল সরে যাওয়ার পর পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।
এদিকে, অসমের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। এখনও লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, শত শত গ্রাম প্লাবিত এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি জলের তলায়। ফলে আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির উপরই নজর থাকবে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের।



