নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার নিয়ে ফের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়াল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ সামনে আসার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্দোলন স্থগিত করার সময় সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, আদালতের পর্যবেক্ষণ তার সঙ্গে মিলছে না। ফলে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে দেশজুড়ে ফের আন্দোলনের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার শীর্ষ আদালত জানায়, যেসব নাবালক বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে আগে কোনও অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তাঁদের অযথা আটক বা হেফাজতে রাখা উচিত নয়। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে পূর্বে অপরাধমূলক অভিযোগ বা মামলা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আদালতের এই অবস্থানই নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করেছে।
সিজেপির অভিযোগ, আন্দোলন প্রত্যাহারের সময় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যে শর্তগুলিতে সম্মতি হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত এফআইআর প্রত্যাহার করা এবং আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া। সংগঠনের দাবি, সেখানে নাবালক বা প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা পূর্ব অপরাধের ইতিহাস রয়েছে কি না— এমন কোনও পৃথক শর্তের উল্লেখ ছিল না।
সংগঠনের মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রতি তাঁদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণকে সামনে রেখে যদি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কার্যকর না করা হয়, তাহলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
সিজেপির বক্তব্য, আদালতের নির্দেশে কোথাও সব মামলা বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাই কেন্দ্র চাইলে আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সংগঠনের মতে, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি— দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা উচিত।
এদিকে সংগঠনের অভিযোগ, কেন্দ্রের সঙ্গে যে লিখিত সমঝোতা হয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক নথিও এখনও তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। এই বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট অবস্থান জানতে চেয়েছে আন্দোলনকারীদের সংগঠন।
সিজেপির দাবি, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার সময় যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনও স্পষ্ট পদক্ষেপ না হওয়ায় তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। প্রয়োজন হলে ফের দেশজুড়ে গণআন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলেও সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, যাঁদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই গুরুতর অভিযোগ বা অপরাধমূলক মামলা রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করার কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ফলে সিজেপির দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই সরকারি মহলের মত।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আদালতের পর্যবেক্ষণ মূলত গ্রেপ্তার ও হেফাজত সংক্রান্ত নীতিগত দিক তুলে ধরেছে। অন্যদিকে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। ফলে এই দুই বিষয়কে এক করে দেখলে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিট প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। মামলা প্রত্যাহার, গ্রেপ্তার হওয়া আন্দোলনকারীদের মুক্তি এবং ভবিষ্যতের আইনি পদক্ষেপ— এই তিনটি বিষয় আগামী দিনে কেন্দ্র ও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে প্রশাসনও। কারণ আন্দোলন পুনরায় শুরু হলে একাধিক রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কেন্দ্রের পরবর্তী অবস্থান এবং সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের বাস্তব প্রয়োগ— দুটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন দেখার, সরকার আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয় কি না এবং আন্দোলনকারী সংগঠন পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে কি না। এই ইস্যুতে আগামী কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করবে বিরোধের নতুন মোড়।



