দিল্লির রাজনৈতিক অন্দরে জল্পনা চলছিল কয়েকদিন ধরেই। তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের সাংসদরা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়ে পৃথক অবস্থান নেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছিল, তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়? অনেকের ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত বিজেপির শিবিরেই আশ্রয় নেবেন এই সাংসদরা। কিন্তু সেই জল্পনায় জল ঢেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটলেন তাঁরা।
শনিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে একটি চিঠি জমা দিয়ে বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদরা জানান, তাঁরা ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চান। পাশাপাশি এনডিএ-কে সমর্থন করার ইচ্ছাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁরা।
বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কাজ করতে আগ্রহী। তাঁর কথায়, উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে সুস্পষ্ট কৌশল। লোকসভায় একই রাজনৈতিক দলের দুটি পৃথক সংসদীয় ব্লক গঠনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক এবং আইনি জটিলতা রয়েছে। তৃণমূলের সাংসদ হয়েও আলাদা ব্লক গঠনের দাবি গ্রহণ করা কঠিন হতে পারত। সেই সম্ভাব্য আইনি বাধা এড়াতেই পৃথক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন বিদ্রোহী সাংসদরা।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া এখনও জাতীয় রাজনীতিতে তেমন পরিচিত নাম নয়। ত্রিপুরা, অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার বাঁকড়ায় দলের একটি কার্যালয় রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তুলনামূলকভাবে ছোট এই রাজনৈতিক দলটির সঙ্গেই নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করতে চলেছেন বিদ্রোহী সাংসদরা।
দিল্লিতে এদিন ঘটনাপ্রবাহ ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমে তৃণমূলের দুই সাংসদ সাগরিকা ঘোষ এবং কীর্তি আজাদ স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা দলের তরফে একটি চিঠি জমা দেন। সেই চিঠিতে বিদ্রোহী সাংসদদের পৃথক সংসদীয় ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ একযোগে স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে পৌঁছন। সেখানে তাঁরা এনসিপিআই-তে যোগদানের ইচ্ছাপত্র জমা দেন এবং ভবিষ্যতে এনডিএ-র প্রতি সমর্থনের কথাও জানান।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু দলত্যাগের ঘটনা নয়, বরং লোকসভায় নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা। সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিলে দলবদল আইন বা অন্যান্য সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে আসতে পারত। অন্যদিকে, একটি পৃথক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মাধ্যমে তাঁরা নতুন পরিচয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করতে চাইছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূলের কাছে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকেই দলের মধ্যে অসন্তোষ, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং একাধিক সাংসদের অবস্থান বদল রাজ্য রাজনীতিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। বিদ্রোহী শিবিরের এই নতুন সিদ্ধান্ত সেই সংকটকে আরও প্রকট করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে এই পদক্ষেপের ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। স্পিকার এই আবেদন গ্রহণ করবেন কি না, বিদ্রোহী সাংসদদের নতুন পরিচয় সংসদীয়ভাবে কীভাবে স্বীকৃতি পাবে এবং এনডিএ-র সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, সেই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
এদিকে বিদ্রোহী সাংসদরা জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে এনসিপিআইয়ের সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হবে। রাজ্যে নতুন পার্টি অফিস খোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। ফলে দিল্লির এই রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের এই সিদ্ধান্ত শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চাল নয়, বরং ভবিষ্যতের বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন নজর স্পিকারের সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে।



