ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement বা FTA) আজ থেকে কার্যকর হওয়ায় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছল। বহু দফা আলোচনার পর বাস্তবায়িত হওয়া এই চুক্তিকে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রের দাবি, এই উদ্যোগের ফলে শুধু আমদানি-রপ্তানিই বাড়বে না, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ব্রিটেন থেকে ভারতে আসা অধিকাংশ পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্রিটিশ পণ্য ভারতীয় বাজারে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যাবে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে ভারতে নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত লিন্ডি ক্যামেরন সামাজিক মাধ্যমে এই দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, এই চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যের ভিত্তি আরও মজবুত করবে।
কোন কোন পণ্যের দাম কমতে পারে?
চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ব্রিটেন থেকে আমদানিকৃত প্রিমিয়াম ও বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে।
সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে স্কচ হুইস্কি ও জিন। এতদিন এই দুই ধরনের মদের উপর ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হত। নতুন চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ধাপে সেই শুল্ক কমে ৭৫ শতাংশ হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে তা আরও কমিয়ে ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ভারতীয় বাজারে স্কচ হুইস্কির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
একইভাবে ব্রিটেনের বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। জাগুয়ার, ল্যান্ড রোভার কিংবা রোলস-রয়েসের মতো ব্র্যান্ডের উপর আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে মাত্র ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এর ফলে এসব গাড়ির দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়াও যেসব পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে, তার মধ্যে রয়েছে—
স্কচ হুইস্কি ও জিন
বিলাসবহুল গাড়ি
স্যামন মাছ
ভেড়ার মাংস
চকোলেট
বিস্কুট
ব্রিটিশ পোশাক
আসবাবপত্র
কোমল পানীয়
প্রসাধনী
চিকিৎসা সরঞ্জাম
মহাকাশ ও বিমান শিল্পের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ
শুল্ক হ্রাসের ফলে এই সমস্ত পণ্য ধীরে ধীরে তুলনামূলক কম দামে ভারতীয় বাজারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য কী সুবিধা?
চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের তালিকায় রয়েছে ভারতের রপ্তানিকারক সংস্থাগুলি। ব্রিটেনে ভারতীয় পণ্যের উপর আগে যেখানে ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হত, এখন বহু ক্ষেত্রেই তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
এর ফলে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া—
তৈরি পোশাক
গৃহস্থালি সামগ্রী
চামড়ার ব্যাগ
জুতো
গয়না
রত্ন
চা
মশলা
সামুদ্রিক পণ্য
কৃষিজ রাসায়নিক
—সবকটি ক্ষেত্রই বড় সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রপ্তানি ব্যয় কমে যাওয়ায় ভারতীয় সংস্থাগুলি ব্রিটিশ বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। একই সঙ্গে ব্রিটেনকে কেন্দ্র করে ইউরোপের অন্যান্য বাজারেও প্রবেশের সুযোগ বাড়বে।
এমএসএমই খাতে বড় প্রভাব
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, দেশের প্রায় ৬ কোটি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) এই চুক্তির সুফল পাবে। ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। শুল্ক কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বাড়বে এবং নতুন ক্রেতা পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্ত্র, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া শিল্প এবং গয়না প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
কীভাবে এগিয়েছে এই চুক্তি?
ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে আলোচনা চলেছে। একাধিক দফায় সরকারি পর্যায়ের বৈঠকের পর গত বছরের ২৪ জুলাই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়।
এরপর দুই দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর বুধবার থেকে তা কার্যকর করা হয়েছে।
বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা
দুই দেশের লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। সরকারি অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
একই সময়ে ব্রিটেনে ভারতের মোট রপ্তানিও প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক কমানো, বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার এবং রপ্তানি ব্যয় হ্রাস—এই তিনটি বিষয়ই আগামী কয়েক বছরে ভারত ও ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।



