দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান বদ্রীনাথ মন্দিরে প্রণামীর অর্থ চুরির অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ ওঠার পরেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বদ্রী-কেদার টেম্পল কমিটি (BKTC)। মন্দিরের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
জানা গিয়েছে, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শুক্রবার BKTC-র কার্যনির্বাহী আধিকারিক সোহন সিং রাঙ্গারের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেয়। সেই অভিযোগে দাবি করা হয়, মন্দির পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মী প্রণামীর অর্থ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। পাশাপাশি সংস্থার অভিযোগ, বিষয়টি আগেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগপত্রে মন্দির চত্বরে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করারও আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে। অভিযোগকারীদের মতে, ভিডিও ফুটেজে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই BKTC-র চেয়ারম্যান হেমন্ত দ্বিবেদী তদন্তের নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সচিব নন। ওই ব্যক্তি মন্দির কমিটির স্থায়ী কর্মী এবং অতীতেও একাধিক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চেয়ারম্যান জানান, তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে আইনি বিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে BKTC-র কার্যনির্বাহী আধিকারিক সোহন সিং রাঙ্গার জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরই মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, অনেক ফুটেজ স্পষ্ট নয়। ফলে শুধুমাত্র ভিডিওর উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, যাঁদের বিরুদ্ধে সন্দেহের তির রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। ওই কমিটি সমস্ত নথি, ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দেবে।
BKTC সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্তে যদি কোনও আর্থিক অনিয়ম বা প্রণামীর অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ১৯৩৯ সালের বদ্রীনাথ-কেদারনাথ টেম্পল কমিটি আইনের অধীনে বিভাগীয় এবং আইনি—দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সম্প্রতি বদ্রীনাথ, কেদারনাথ-সহ গাড়োয়াল অঞ্চলের অধীন ৪৯টি মন্দিরে অনুদান সংগ্রহ ও হিসাবরক্ষণ আরও স্বচ্ছ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের পরপরই এমন অভিযোগ সামনে আসায় মন্দির প্রশাসনের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
চলতি চারধাম যাত্রা মরশুমে ভক্তদের ভিড়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। BKTC-র তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত শুধু বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ মন্দির মিলিয়ে প্রায় ৭০ কোটি টাকার অনুদান জমা পড়েছে। পাশাপাশি কমিটির পরিচালিত অতিথিশালাগুলি থেকেও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব এসেছে।
প্রতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই দুই তীর্থক্ষেত্রে কয়েক কোটি টাকার প্রণামী জমা পড়ে। সূত্রের দাবি, গড়ে ৫০ থেকে ৮০ কোটি টাকার মধ্যে অনুদান আসে। এত বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেনের কারণে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এই আবহে প্রণামীর অর্থ চুরির অভিযোগ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মন্দির প্রশাসনের নজরদারি ব্যবস্থা, হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে তদন্ত রিপোর্টের দিকেই এখন নজর প্রশাসন, ভক্তমহল এবং সংশ্লিষ্ট সকলের।



