সপ্তাহের শেষ ট্রেডিং সেশনে তীব্র চাপের মুখে পড়ল ভারতীয় শেয়ারবাজার। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলিতে ব্যাপক বিক্রির ঢেউ নেমে আসে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারের প্রধান সূচকগুলিতেও। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে এবং বাজারে রীতিমতো রক্তক্ষরণের ছবি দেখা যায়।
শুক্রবার লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তি সূচক প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। বাজারের সামগ্রিক মনোভাবও দ্রুত নেতিবাচক হয়ে ওঠে। সেনসেক্স একসময় ৮০০ পয়েন্টেরও বেশি নিচে নেমে আসে, অন্যদিকে নিফটি পিছিয়ে যায় ২৩,৯৫০ পয়েন্টের নিচে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দ্রুত বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের বিপুল সম্পদ ক্ষয় হয়েছে।
এই আকস্মিক ধসের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি পরিষেবা এবং কনসাল্টিং সংস্থা অ্যাকসেঞ্চারের সাম্প্রতিক আর্থিক পূর্বাভাস। সংস্থাটি ২০২৬ অর্থবর্ষের রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাব্য সীমা আগের তুলনায় কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি পরিষেবা খাতে আগামী দিনে প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক বৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যাকসেঞ্চারের এই মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, সংস্থাটিকে প্রযুক্তি পরিষেবা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা তাদের প্রযুক্তি ব্যয়ের পরিকল্পনা কতটা আগ্রাসী হবে, সে বিষয়ে অ্যাকসেঞ্চারের পূর্বাভাসকে বাজার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। ফলে তাদের সতর্কবার্তা বিশ্বব্যাপী আইটি শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও এই উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে সরাসরি। দেশের বৃহৎ আইটি কোম্পানিগুলির উল্লেখযোগ্য অংশের আয় আসে বিদেশি বাজার থেকে, বিশেষত আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে। সেই কারণে মার্কিন বাজারে প্রযুক্তি খাতে ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে ভারতীয় কোম্পানিগুলির ভবিষ্যৎ আয় নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়।
এই আশঙ্কার জেরে প্রথম সারির প্রায় সমস্ত আইটি সংস্থার শেয়ারেই বড় পতন দেখা যায়। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএল টেক এবং টেক মাহিন্দ্রার শেয়ারে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেয়ারদর ৩ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিনিয়োগকারীদের একাংশ নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার জন্য দ্রুত শেয়ার বিক্রি শুরু করেন, ফলে পতনের গতি আরও বেড়ে যায়।
শুধু বড় কোম্পানিই নয়, মাঝারি মাপের সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলিও এই ধাক্কা থেকে রেহাই পায়নি। কোফোর্জ, হেক্সাওয়ার টেকনোলজিস, সোনাটা সফটওয়্যার, টাটা এলক্সি এবং কেপিআইটি টেকনোলজিসের মতো সংস্থাগুলির শেয়ারেও তীব্র চাপ দেখা যায়। একাধিক সংস্থার বাজারমূল্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকা কমে যায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে আসায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ বাড়ছিল। দালাল স্ট্রিটেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক মনোভাব ফিরতে শুরু করেছিল।
কিন্তু অ্যাকসেঞ্চারের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস সেই আশাবাদে বড় ধাক্কা দিয়েছে। প্রযুক্তি পরিষেবার চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হতে পারে—এই বার্তাই বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে বিদেশি সংস্থার প্রযুক্তি বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল। ফলে মার্কিন বাজারে যদি ব্যয় কমে, তবে ভারতীয় কোম্পানিগুলির আয় ও মুনাফার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই পতনকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার আগে পরিস্থিতি আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি খাত এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো ক্ষেত্রগুলিতে চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তা সত্ত্বেও স্বল্পমেয়াদে বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির ব্যয় পরিকল্পনা, মার্কিন সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি আগামী কয়েক মাসে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
শুক্রবারের লেনদেন অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য নেতিবাচক ইঙ্গিতও ভারতীয় আইটি খাতকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আর সেই কারণেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দালাল স্ট্রিটে ফিরে এসেছে উদ্বেগের আবহ, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের।



