যন্তর মন্তরে চলা ছাত্র ও যুব আন্দোলনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিলেন এক ‘ক্ষমাসুন্দর’ বার্তা। শুক্রবার রাতে প্রকাশিত প্রায় আড়াই মিনিটের ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপমান, কটাক্ষ কিংবা রাগের মাধ্যমে কোনও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং ভুল বুঝে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানান, বিক্ষোভের সময় তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি তাঁর প্রয়াত মাকেও নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার পথ বেছে নেওয়ার কথা বলেন মোদি।
তিনি বলেন, যারা এই ধরনের মন্তব্য করেছেন, তাঁদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। পাশাপাশি সমাজের কাছেও তাঁদের ক্ষমা করার আবেদন জানান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
মোদি বলেন, সমাজে রাগ, হতাশা এবং ক্ষোভ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আবেগকে সঠিক পথে পরিচালিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তরুণদের ভুল হলে তাঁদের দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং বোঝানো এবং সংশোধনের সুযোগ করে দেওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মানুষ ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পায়। ছোটবেলায় যেমন ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে, তেমনই যৌবনেও নিজের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে সঠিক পথে ফেরার সুযোগ রয়েছে। তবে যৌবনের সময় দায়িত্ববোধ আরও বেশি থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি ভুল পথে পরিচালিত হয়, তার পেছনে অনেক সময় ভুল তথ্য বা ভুল পরামর্শ কাজ করে। তাই শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সহানুভূতি এবং আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের বোঝানো।
তিনি বলেন, সমাজে বিভাজন বা সংঘাত বাড়ানোর বদলে সবাইকে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মই ভারতের ভবিষ্যৎ, তাই তাঁদের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, গত প্রায় এক মাস ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্রদের একটি সংগঠন বিক্ষোভ চালাচ্ছে। নিট পরীক্ষায় অনিয়ম এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের মধ্যে কিছু ব্যক্তি ঢুকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশের দাবি, আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কয়েকজন বহিরাগত হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছিল। সেই ঘটনায় কয়েকজনকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
এই আন্দোলনের মাঝেই এক তরুণীর করা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ওই মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটেই প্রধানমন্ত্রীর এই ভিডিও বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।
মোদির বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে তরুণদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, যারা আবেগের বশে ভুল করেছে, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী আরও আবেদন জানান, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে দূরে থেকে দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁর মতে, মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঐক্য প্রয়োজন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে এটি প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় রাতের ভিডিও বার্তা। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র আন্দোলনের আবহে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তার মধ্যে একদিকে যেমন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা রয়েছে, তেমনই তরুণ সমাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বার্তাও রয়েছে। বিশেষ করে যুবসমাজকে বিরোধিতার পথ থেকে সরিয়ে গঠনমূলক কাজে যুক্ত করার আহ্বান এই বক্তব্যের অন্যতম দিক।
এদিকে, যন্তর মন্তরের আন্দোলন ঘিরে প্রশাসনের নজরদারি এখনও জারি রয়েছে। বিক্ষোভের নামে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে দিল্লি পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তার শেষে দেশের উন্নয়নের কাজে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, ভুল হয়ে গেলে তা শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিভাজনের বদলে সহযোগিতার পথই বেছে নিতে হবে।



