দীর্ঘ দুই বছর রাজনৈতিক নীরবতার পর ফের জনসমক্ষে সরব হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, "আমি মুজিব কন্যা। আমাকে জেলে পাঠানো হতে পারে, মিথ্যা মামলায় জড়ানো হতে পারে, এমনকি হত্যা করার চেষ্টাও হতে পারে। কিন্তু আমি ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরব। দেশের মানুষের জন্য এবং দেশকে সঠিক পথে ফেরানোর জন্য আমার ফিরে যেতেই হবে।"
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাকে স্মরণ করে হাসিনা বলেন, সেদিনের পরিস্থিতিকে ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তা ছিল সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তাঁর দাবি, শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার পথ খোলা হয়েছিল। কোটা সংস্কার প্রশ্নে সরকার ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল এবং মন্ত্রিসভার প্রতিনিধিরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন। কিন্তু পরে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায় এবং সরকারের পতনই প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, "এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। সংগঠিতভাবে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে পুরো পরিস্থিতি পরিচালিত হয়েছিল।"
শেখ হাসিনার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগে যে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল, আজ সেই রাষ্ট্রের আদর্শ থেকে দেশ অনেকটাই সরে গিয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিও চাপে রয়েছে।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিল্প উৎপাদন কমেছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরও চাপ বেড়েছে এবং সরকারকে নিয়মিত ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
হাসিনা আরও বলেন, "দেশের বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বহু ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতা আমরা তৈরি করেছিলাম, তা এখন আর নেই।"
২০২৪ সালের সহিংসতার প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁর সরকার তখন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল যাতে প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব হয়। কিন্তু পরবর্তী সরকার সেই তদন্ত এগোতে দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যদি বর্তমান প্রশাসনের কোনও ভয় না থাকে, তাহলে তদন্তের ফলাফল সামনে আসতে বাধা কোথায়?
বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিভিন্ন মামলার প্রসঙ্গও এদিন উঠে আসে। গণহত্যাসহ একাধিক অভিযোগে আদালতের রায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, তিনি বিচার প্রক্রিয়া থেকে পালাতে চান না। তবে ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাঁর কথায়, "আমি আত্মসমর্পণ করতেও প্রস্তুত। কিন্তু আমার দেশের মাটিতে ফিরতে চাই।"
তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আদালতের নির্দেশ অনুসারে আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার পাশাপাশি ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনিও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংবাদমাধ্যমের উপর চাপ এবং চরমপন্থী সংগঠনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক মহল এবং বিশেষ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে এই বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক শাকিব আল হাসান-সহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ভার্চুয়ালি যোগ দেন। তাঁরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মতামতও তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু—তিস্তা জলবণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—নিয়ে টানাপোড়েনের আবহে তাঁর এই প্রকাশ্য বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার এই বার্তা শুধু তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশেই নয়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিও একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত। তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেও মত অনেকের।
অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ, একদিকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়া এখনও বহাল রয়েছে। ফলে দেশে ফেরার পথ কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তবে সব বিতর্কের মাঝেও শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যের শেষে স্পষ্ট করে দেন, তিনি রাজনৈতিক লড়াই ছাড়ছেন না। তাঁর কথায়, "আমাকে থামানো যাবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমি আবারও ফিরব।" এই ঘোষণার পর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা ও বিশ্লেষণ।



