দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শেষ হল সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দিল্লির মেদান্ত হাসপাতালে অনশন ভাঙলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম। তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।
হাসপাতালে গিয়ে সোনমের সঙ্গে দেখা করেন দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এরপর জেপি নাড্ডা নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দিয়ে তাঁর অনশন ভাঙান। সেই মুহূর্তের ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, সোনম দুই মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
সোনম বলেন, অনশন ভাঙতে পেরে তিনি স্বস্তি অনুভব করছেন এবং এই সময়ে পাশে থাকা সকলকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি নিজের স্ত্রী গীতাঞ্জলির প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
অনশন ভাঙার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সোনম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ৬৫ জন সাংসদ তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছিলেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং সরকারের পদক্ষেপ বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দাবিতে গত ২৬ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেছিলেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিবাদের আবহ তৈরি হয়।
প্রথম দিকে যন্তর মন্তরেই অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু নিজের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা গ্রহণেও অনীহা প্রকাশ করেছিলেন সোনম। হাসপাতাল থেকেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তাঁকে দিল্লির মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ছাত্রদের স্বার্থে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে তাঁর আন্দোলন চলবে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আপস করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়ে বলেন, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যারা পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত তৈরির বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানান।
মোদি আরও জানান, প্রশ্নফাঁস রোধে আইনি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ নিয়ে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিরোধী দলগুলি তাঁর দাবিকে সমর্থন করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়। অন্যদিকে, কেন্দ্র দাবি করে, প্রশ্নফাঁসের মতো সমস্যার সমাধানে সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
আন্দোলনের সময় সোনমের পাশে দাঁড়িয়েছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। তাদের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানো হয়।
সোনমের অনশন ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তাঁর সমর্থকদের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে এখন বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে, সংসদের আগামী অধিবেশনে প্রশ্নফাঁস রোধে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গিয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, পরীক্ষার পবিত্রতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২৬ দিনের দীর্ঘ অনশনের পর সোনম ওয়াংচুক আপাতত আন্দোলনের এই পর্ব শেষ করলেও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে তাঁর অবস্থান যে অব্যাহত থাকবে, তা তাঁর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।



