দীর্ঘ অনশনের পর সরকারের সঙ্গে সমঝোতা
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঝাড়খণ্ডে বেশ কিছুদিন ধরেই সরব পড়ুয়ারা। পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত, সিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া এবং নিয়োগ পরীক্ষার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাঁরা।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো। রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে তিনি টানা ১৬ দিন অনশন করেন। তাঁর সঙ্গে অনশনে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রনেতা উম্মে হাবিবা এবং রাহুল ক্রান্তিও। দীর্ঘদিন ধরে চলা অনশনের জেরে বিষয়টি নিয়ে চাপ বাড়ছিল রাজ্য সরকারের উপরও।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন রাজ্য সরকারের দুই মন্ত্রী দীপিকা পাণ্ডে সিং এবং ইরফান আনসারি। একাধিক দফায় আলোচনার পর পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পড়ুয়াদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে টিডিপিএলের মাধ্যমে ২০১৪ সালের পর থেকে নেওয়া প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলি বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই ঘোষণার পরই অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন দেবেন্দ্র। রাতে ফলের রস খাইয়ে তাঁর অনশন ভাঙানো হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য আন্দোলনকারীরাও অনশন শেষ করেন।
‘সরকারের সিদ্ধান্ত সাহসী’
পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেবেন্দ্র মাহাতো। তাঁর বক্তব্য, সরকার এমন একটি সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যখন সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। ফলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনের পক্ষে সহজ ছিল না বলেই মনে করছেন তিনি।
দেবেন্দ্র বলেন, সরকার অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ করেছে। তাঁর মতে, জেএসএসসি সিজিএল পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। এমনকি চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের নিয়োগও প্রায় নিশ্চিত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এই অবস্থায় গোটা প্রক্রিয়া বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। তবুও পড়ুয়াদের অভিযোগ ও বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার জন্য তিনি রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তবে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও দেবেন্দ্রদের আন্দোলনের সমস্ত দাবি পূরণ হয়নি। বিশেষ করে গোটা ঘটনায় সিবিআই তদন্তের যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন আন্দোলনকারীরা, সেই বিষয়ে এখনও রাজি হয়নি হেমন্ত সোরেনের সরকার। ফলে পরীক্ষাগুলি বাতিল হলেও দুর্নীতির অভিযোগের উৎস এবং এর পিছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে তদন্তের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
২৪ দিনের আন্দোলন, ১৬ দিনের অনশন
নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল প্রায় ২৪ দিন আগে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। শেষপর্যন্ত অনশনকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার করেন দেবেন্দ্র মাহাতো। রাঁচিতে তাঁর অবস্থান ঘিরে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সমর্থন তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীদের মূল বক্তব্য ছিল, সরকারি চাকরির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনও প্রশ্নফাঁস বা প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে, তার জন্য স্থায়ী সংস্কারের দাবিও জানানো হয়।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন আরও রাজনৈতিক মাত্রা পেতে শুরু করে। রবিবার সন্ধ্যায় রাঁচিতে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কুশপুতুল পোড়ান বিক্ষোভকারীরা। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। ছাত্রদের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও চাপ তৈরি হয়।
হেমন্তকে চিঠি রাহুলের
ছাত্র আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীও মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
রাহুলের বক্তব্য ছিল, সংবিধান শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার দিয়েছে। সেই কারণে পড়ুয়াদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা প্রয়োজন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে হেমন্ত সোরেনকে অনুরোধ করেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজে যেন আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের বক্তব্য শোনেন।
একদিকে দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলন, অন্যদিকে বিরোধীদের চাপ এবং রাহুল গান্ধীর চিঠি—সব মিলিয়ে সরকারের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত সোমবারের বৈঠকে পরীক্ষা বাতিল ও সংস্কারের বিষয়ে সরকারের ঘোষণা পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করে।
আন্দোলন কি পুরোপুরি শেষ?
সরকারের সিদ্ধান্তের পর আপাতত দেবেন্দ্র মাহাতো অনশন প্রত্যাহার করলেও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কারণ, পড়ুয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি—সিবিআই তদন্ত—এখনও পূরণ হয়নি।
পরীক্ষা বাতিল হলে চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা কবে নেওয়া হবে, পুরনো পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম কার্যকর হবে এবং নতুন ব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কার আনা হবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরও এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যে প্রার্থীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তবে দীর্ঘ ১৬ দিনের অনশন আপাতত শেষ হওয়ায় ঝাড়খণ্ডের রাজনীতিতে এবং ছাত্র আন্দোলনে স্বস্তি ফিরেছে। সরকারের ঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং নতুন নিয়োগ পরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ করা যায়, তার উপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতির পরবর্তী গতি। সিবিআই তদন্তের দাবি নিয়ে সরকার নিজের অবস্থান বদলায় কি না, সেটিও নজরে থাকবে।
এই মুহূর্তে তাই পরীক্ষার বাতিলের ঘোষণা ছাত্রদের বড় সাফল্য হলেও আন্দোলনের সম্পূর্ণ ইতি ঘটেছে—এমনটা বলার সময় এখনও আসেনি।



