সুপ্রিম কোর্টে জনপ্রতিনিধিদের ফৌজদারি মামলার হিসাব
দেশের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা ফৌজদারি মামলার সংখ্যা নিয়ে ফের সামনে এল গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান। সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা একটি রিপোর্টে দেশের মুখ্যমন্ত্রী, সাংসদ এবং বিধায়কদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। শীর্ষ আদালত নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি বিজয় হংসরিয়া এই রিপোর্ট পেশ করেছেন বলে জানা গিয়েছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। মামলার সংখ্যার বিচারে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৮৯টি মামলা থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন কর্নাটকের ডিকে শিবকুমার। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সংখ্যক মামলা রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডুর বিরুদ্ধেও। এরপর কেরলের ভিডি সতীশনকে তালিকায় রাখা হয়েছে ১৮টি মামলাসহ।
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এবং মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফড়ণবিসের বিরুদ্ধে পাঁচটি করে মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। হিমাচল প্রদেশের সুখবিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধে চারটি মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়াও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর বিরুদ্ধে দু’টি করে মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সিকিমের প্রেম সিং তামাং, পাঞ্জাবের ভগবন্ত মান, ওড়িশার মোহনচরণ মাঝি এবং রাজস্থানের ভজনলাল শর্মার বিরুদ্ধেও একটি করে মামলা থাকার কথা জানানো হয়েছে।
সাংসদদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা
শুধু মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধেই নয়, দেশের সাংসদদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে উঠে এসেছে এই রিপোর্টে। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে মোট ৩২৬ জন সাংসদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, লোকসভার মোট ৫৪৩ জন সদস্যের মধ্যে ২৫১ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধেই কোনও না কোনও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন।
রাজ্যসভার ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব একটা আলাদা নয়। ২৩৩ জন রাজ্যসভা সাংসদের মধ্যে ৭৫ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকার কথা রিপোর্টে বলা হয়েছে। ফলে দুই কক্ষ মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়াচ্ছে ৩২৬।
পশ্চিমবঙ্গের সাংসদদের ক্ষেত্রেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান। রাজ্য থেকে নির্বাচিত ৪২ জন সাংসদের মধ্যে ১৬ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলার সাংসদদের একটি বড় অংশই এই তালিকায় রয়েছেন।
বিধায়কদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক ছবি
জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলার হিসাব করতে গিয়ে রাজ্য বিধানসভাগুলির ছবিও উঠে এসেছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বিধায়কের সংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।
বাংলায় দল নির্বিশেষে ১৭০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের মোট বিধায়কের প্রায় ৫৮ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের পর রয়েছে কেরল। সেখানে ৫৭ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে ৫৬ জন এবং তেলেঙ্গানায় ৪৯ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার ক্ষেত্রেও সংখ্যাটি যথেষ্ট বেশি। দুই রাজ্যেই ৪৫ জন করে বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকার কথা জানানো হয়েছে।
মামলা থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত নয়
তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মনে রাখা প্রয়োজন। কোনও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকা এবং আদালতে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। মামলা বিচারাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনত দোষী বলা যায় না, যতক্ষণ না আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করছে।
তাই সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা রিপোর্টে থাকা সংখ্যাগুলি মূলত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত বা বিচারাধীন মামলার হিসাব হিসেবে দেখা উচিত। অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
তবু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক ফৌজদারি মামলা থাকার তথ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধিদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামায় তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা প্রকাশের নিয়ম রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভোটারদের সামনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলার বিষয়টি আসে।
বাংলার ক্ষেত্রে কেন বাড়তি গুরুত্ব
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে রিপোর্টের পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ২৯টি মামলার উল্লেখ রয়েছে, অন্যদিকে রাজ্যের ১৭০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকার দাবি করা হয়েছে। সাংসদদের ক্ষেত্রেও ৪২ জনের মধ্যে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
ফলে বিধানসভা থেকে সংসদ—দুই স্তরেই বাংলার জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিধায়কদের ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে রাজ্যের প্রথম স্থানে থাকার তথ্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনী সংস্কার এবং জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চলা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি—সবকটি বিষয়ই ফের আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে। কারণ বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন হয়ে যায়।
দ্রুত বিচার নিয়েও প্রশ্ন
জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে মামলা হলে তার বিচার দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আদালতও গুরুত্ব দিয়েছে। তবে একইসঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকার এবং ন্যায্য বিচারের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়া এই রিপোর্ট তাই শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, দেশের বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যভান্ডার হিসেবে সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী থেকে সাংসদ, আবার বিধায়ক—প্রায় প্রতিটি স্তরেই ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এখন নজর থাকবে এই রিপোর্টকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে কী আলোচনা হয় এবং জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়ে ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাশাপাশি, রিপোর্টে উল্লেখ করা মামলাগুলির কোনগুলি এখনও বিচারাধীন এবং কোনগুলির নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।



