দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি জটিলতা মেটাতে বড় পদক্ষেপ করল জনসন অ্যান্ড জনসন। ট্যাল্ক-ভিত্তিক বেবি পাউডার ব্যবহারের ফলে ক্যানসার হওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালতে দায়ের হওয়া বিপুল সংখ্যক মামলার নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে সংস্থাটি। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা।
সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আর্থিক সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বিচারাধীন প্রায় ৬৯ হাজার মামলা অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে চলমান অধিকাংশ আইনি দাবি এই চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তির পথে এগোতে পারে। জনসন অ্যান্ড জনসনের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রায় ৯৯.৭৫ শতাংশ মামলাই এই সমঝোতার আওতায় চলে আসবে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ট্যাল্ক নামের একটি প্রাকৃতিক খনিজ, যা বহু বছর ধরে বেবি পাউডারের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। বিভিন্ন মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, এই ট্যাল্কে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ব্যবহারকারীদের ক্যানসারের ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং মেসোথেলিওমার মতো গুরুতর রোগের সঙ্গে এই পণ্যের সম্ভাব্য সম্পর্কের অভিযোগ আদালতে তোলা হয়েছে।
তবে শুরু থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে জনসন অ্যান্ড জনসন। সংস্থার বক্তব্য, ট্যাল্ক-ভিত্তিক তাদের পণ্যের কারণে ক্যানসার হয়— এমন কোনও চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের দাবি, বহু গবেষণাতেই পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
তবুও বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হওয়ায় সংস্থাটি ধাপে ধাপে বাজার থেকে ট্যাল্ক-ভিত্তিক বেবি পাউডার সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই পণ্যের বিক্রি বন্ধ করা হয়। পরে ২০২৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়েই ট্যাল্ক-ভিত্তিক বেবি পাউডারের বিপণন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তার পরিবর্তে কর্নস্টার্চ-ভিত্তিক পণ্য বাজারে আনা হয়।
এদিকে, ২০২৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) ট্যাল্ককে মানুষের ক্ষেত্রে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ (possibly carcinogenic) উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। যদিও এই মূল্যায়ন সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে, তা সরাসরি সব ধরনের ট্যাল্ক ব্যবহারে ক্যানসার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে না।
ট্যাল্ককে ঘিরে আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় প্রায় এক দশক আগে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক মহিলার ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে মৃত্যুর ঘটনায় আদালত জনসন অ্যান্ড জনসনকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে সেই রায় বাতিল হলেও, ওই ঘটনার পর দেশজুড়ে একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে হাজার হাজার মামলা দায়ের হতে থাকে।
ক্রমশ আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় সংস্থার উপর আর্থিক ও আইনি চাপও বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন মামলায় আদালত অভিযোগকারীদের পক্ষে রায় দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটেই দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।
জনসন অ্যান্ড জনসনের মামলাবিষয়ক প্রধান এরিক হাস জানিয়েছেন, এই সমঝোতা বহু বছরের আইনি অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তাঁর মতে, বিপুল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি হলে সংস্থা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
তবে এই চুক্তির আওতায় সব মামলা অন্তর্ভুক্ত হবে না। সমঝোতার পরও কিছু নতুন বা পৃথক আইনি দাবি আদালতে চলতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের হওয়া কয়েকটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সংস্থা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে ট্যাল্ক-ভিত্তিক পণ্য বিক্রি চালিয়ে গিয়েছিল। এই অভিযোগও সংস্থা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি সংস্থার দায় স্বীকারের সমান নয়। বহু ক্ষেত্রেই দীর্ঘ আইনি লড়াই এড়াতে এবং অনিশ্চয়তা কমাতে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি এই ধরনের আর্থিক সমঝোতার পথ বেছে নেয়।
বিশ্বজুড়ে ভোক্তা সুরক্ষা, পণ্যের নিরাপত্তা এবং কর্পোরেট দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে জনসন অ্যান্ড জনসনের এই মামলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে এই সমঝোতা আদালতের অনুমোদন পেলে বহু বছরের আইনি বিতর্কের বড় অংশের ইতি ঘটতে পারে।



