ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারকে ঘিরে আমেরিকার আগ্রহ নতুন নয়। তবে এবার বিপুল পরিমাণ তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরাসরি চুক্তির ঘোষণা করে বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলকে কেন্দ্র করে এই চুক্তি করা হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য, এই উদ্যোগ শুধু ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলবে না, আমেরিকার জ্বালানি বাজারেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক লেনদেন’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, এর ফলে আমেরিকার তেল মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং দেশের জন্য জ্বালানির সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে। সরবরাহ বাড়লে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জন্য গ্যাসোলিনের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের ঘোষণার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলসম্পদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশটি সেই সম্পদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। নিষেধাজ্ঞা, উৎপাদন পরিকাঠামোর দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে দেশটির তেলশিল্প বারবার সমস্যার মুখে পড়েছে।
এখন নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজের বক্তব্যেও সেই আশার প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর আশা, তেলশিল্পে নতুন করে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতিও ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে।
ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিমাণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। সৌদি আরবের তেলসম্পদের তুলনায়ও ভেনেজুয়েলার মজুত বেশি বলে দাবি করা হয়। বিপুল এই সম্পদের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন সেই তুলনায় অনেক কম। দেশটিতে দৈনিক প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এই জায়গাতেই নতুন চুক্তির গুরুত্ব। আমেরিকার লক্ষ্য যদি ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় আকারে পুনর্গঠন করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক তেল বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে এলে অপরিশোধিত তেলের দামে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইসঙ্গে আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তাও শক্তিশালী হতে পারে।
ট্রাম্প নিজেও মূলত এই অর্থনৈতিক দিকটিকেই সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তির ফলে আমেরিকার হাতে থাকা তেলের মজুত বাড়বে এবং সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জ্বালানি খরচ কমতে পারে। যদিও এই প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের উপর।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে বিষয়টির রাজনৈতিক দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে চিন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে এই দুই দেশের প্রভাব নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। ফলে কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের পরিবর্তনকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে না।
এর আগে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের ঘটনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওই অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। তবে এই ধরনের গুরুতর দাবির ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য এবং সরকারি বিবৃতি দিয়ে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মাদুরো সরকারের সঙ্গে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সংঘাতের পেছনে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থেকেছে। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা এবং কারাকাসের পালটা অবস্থানের কারণে দেশটির তেলশিল্প বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ছিল। ফলে এখন ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন চুক্তির ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির জন্যও তেলশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সরকারি রাজস্ব, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে তেলখাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ এলে উৎপাদন বাড়তে পারে, পরিকাঠামোর উন্নতি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনেজুয়েলার অবস্থানও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চুক্তির বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে এর শর্ত, তেল উত্তোলনের অধিকার, বিনিয়োগ কাঠামো এবং রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থার উপর। ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও সেই তেল কীভাবে উত্তোলন করা হবে, কোন সংস্থাগুলি যুক্ত থাকবে এবং ভেনেজুয়েলা কতটা আর্থিক সুবিধা পাবে—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত এখনও সামনে আসেনি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আন্তর্জাতিক তেল বাজার। ভেনেজুয়েলার উৎপাদন দ্রুত বাড়লে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হতে পারে। তাতে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একইসঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি এবং অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশের নীতিও বাজারের দামের উপর প্রভাব ফেলবে।
আমেরিকার জন্য ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিম গোলার্ধ থেকেই বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহ করতে পারলে ওয়াশিংটনের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে চুক্তিটিকে শুধু বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের ‘বিশ্বের বৃহত্তম তেল চুক্তি’ মন্তব্যের বাস্তব অর্থ কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য, কোন সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে এবং ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল কীভাবে হিসাব করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হলে ঘোষণাটির পূর্ণ পরিধি বোঝা কঠিন।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ঘোষণা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকার দাবি অনুযায়ী সরবরাহ বাড়লে জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে, আর ভেনেজুয়েলার আশা অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত চুক্তি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয় এবং এর ফলে তেলবাজারে কতটা পরিবর্তন আসে।



