বালোচিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। স্বাধীনতাপন্থী বালোচ সংগঠনগুলির তরফে ১১ আগস্টকে ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কর্মসূচি ঠেকাতে পাকিস্তানি প্রশাসন এবং নিরাপত্তাবাহিনী একাধিক কড়া পদক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় বিধিনিষেধ জারি, ধরপাকড় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনতাপন্থীদের ঘোষণার পর থেকেই বালোচিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে খবর। ১১ আগস্ট কোনও ধরনের সমাবেশ বা প্রকাশ্য কর্মসূচি যাতে আয়োজন করা না যায়, সেজন্য প্রশাসনের তরফে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা বহাল রাখার সিদ্ধান্তের কথাও সামনে এসেছে। ফলে আগামী কয়েক দিন সাধারণ মানুষের চলাচল ও জমায়েতের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।
বালোচিস্তানের স্বাধীনতাপন্থী মহল অবশ্য পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বালোচ লিবারেশন আর্মির নেতা মির ইয়ার বালোচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা জারি করেও বালোচ জনগণকে স্বাধীনতা দিবস পালন থেকে আটকানো সম্ভব হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষ ইতিমধ্যেই ১১ আগস্টের কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর নির্দেশকে তাঁরা মেনে নেবেন না।
স্বাধীনতাপন্থীদের তরফে ১১ আগস্টের কর্মসূচিকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বালোচিস্তানের বাসিন্দাদের নিজেদের বাড়িতে পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পাড়া, বাজার, দোকান এবং অন্যান্য জনবহুল জায়গাতেও স্বাধীনতাপন্থী পতাকা তোলার ডাক দেওয়া হয়েছে। বিদেশে বসবাসকারী বালোচদের কাছেও একই দিনে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে খবর।
১১ আগস্টকে কেন বালোচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতাপন্থী বালোচ নেতাদের দাবি, ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে বালোচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাঁদের বক্তব্য, সেই সময় ভারত ও পাকিস্তান এখনও স্বাধীন হয়নি। পরে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। সেই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকেই সামনে রেখে বালোচ স্বাধীনতাপন্থীরা ১১ আগস্টকে নিজেদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
তবে বালোচিস্তানের ইতিহাস নিয়ে এই ব্যাখ্যা এবং স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধ রয়েছে। ইসলামাবাদ বালোচিস্তানকে পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখে। ফলে স্বাধীনতার ঘোষণা বা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে কোনও প্রচেষ্টাকে তারা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরেই বালোচিস্তানে সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতার দাবি রয়েছে। এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত সংগঠন বালোচ লিবারেশন আর্মি। পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সংঘাত চলছে। বিভিন্ন সময়ে সেনা ও স্বাধীনতাপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অপহরণ, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, বেআইনি আটক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও নিয়মিত সামনে এসেছে।
বালোচ স্বাধীনতাপন্থীদের অভিযোগ, ইসলামাবাদ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করতে চাইছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা অভিযানের নামে সাধারণ মানুষের উপরও অত্যাচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। পাকিস্তান অবশ্য এই অভিযোগগুলির অনেকটাই অস্বীকার করে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরে।
বালোচিস্তানকে ঘিরে সংঘাতের পিছনে অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই প্রদেশে গ্যাস, তেল এবং বিভিন্ন খনিজের বড় মজুত রয়েছে। স্বাধীনতাপন্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে পাকিস্তানের অন্যান্য অংশ এবং কেন্দ্রীয় সরকার বেশি সুবিধা পেলেও স্থানীয় জনগণ সেই অনুপাতে উন্নয়নের সুফল পাননি। বেকারত্ব, দারিদ্র, অনুন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগ থেকেই স্বাধীনতার দাবিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও বালোচিস্তানে অসন্তোষ বেড়েছে। পাকিস্তান ও চিনের মধ্যে এই বিশাল পরিকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বালোচিস্তানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে গওয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে চিনা বিনিয়োগ এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয়দের একাংশের আপত্তি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্পগুলিতে বালোচ জনগণের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে বালোচিস্তান কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগরের উপকূলবর্তী এই প্রদেশের অবস্থান এবং গওয়াদর বন্দরের গুরুত্বের কারণে অঞ্চলটির উপর নিয়ন্ত্রণ ইসলামাবাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে স্বাধীনতাপন্থী আন্দোলন যত জোরদার হচ্ছে, ততই পাকিস্তানের নিরাপত্তা কৌশল কঠোর হচ্ছে।
১১ আগস্টকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেই দীর্ঘ সংঘাতেরই নতুন অধ্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাধীনতাপন্থীদের পক্ষ থেকে ঘরে ঘরে পতাকা তোলার ডাক মূলত প্রতীকী আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। প্রকাশ্য বড় সমাবেশের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের বাড়ি, দোকান বা স্থানীয় এলাকায় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে পাকিস্তানি প্রশাসনের বিধিনিষেধের কারণে পরিস্থিতি কতটা শান্ত থাকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকলে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযান এবং স্বাধীনতাপন্থীদের কর্মসূচি মুখোমুখি হলে সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে।
বালোচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি পাকিস্তানের জন্য শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় পূর্ব পাকিস্তান হারানোর পর থেকেই দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেই কারণেই বালোচিস্তানের বিচ্ছিন্নতার দাবি ইসলামাবাদের কাছে বিশেষভাবে উদ্বেগের।
এখন ১১ আগস্টের কর্মসূচি বাস্তবে কতটা বড় আকার নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একদিকে স্বাধীনতাপন্থীরা সাধারণ মানুষকে প্রতীকী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানি প্রশাসন তা ঠেকাতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। ফলে ১১ আগস্ট বালোচিস্তানে শুধু একটি ঘোষিত ‘স্বাধীনতা দিবস’ নয়, পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতাপন্থী আন্দোলনের শক্তিরও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।



