উৎসবের মরশুমে বাড়তি ট্রেনের সিদ্ধান্ত
দুর্গাপুজো, দীপাবলি এবং ছটপুজো—পরপর একাধিক উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই রেলে যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে বিহার, উত্তরপ্রদেশ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ভিড় বাড়ে। আবার পুজোর ছুটিতে দিঘার মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রেও বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ যান।
এই অতিরিক্ত চাপের কথা মাথায় রেখেই এবার একগুচ্ছ স্পেশাল ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করেছে পূর্ব রেল। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই পরিষেবাগুলি চালানো হবে।
ফলে নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি উৎসবকালীন যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত আসন ও পরিষেবার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে যাঁরা শেষ মুহূর্তে নিয়মিত ট্রেনে টিকিট না পেয়ে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্য স্পেশাল ট্রেনগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কোন কোন রুটে চলবে বিশেষ ট্রেন?
পূর্ব রেলের ঘোষণা অনুযায়ী, অন্তত সাতটি রুটে বাড়তি ট্রেন চালানো হবে। বাংলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টেশন থেকে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে এই অতিরিক্ত যোগাযোগ তৈরি হবে।
প্রধান রুটগুলির মধ্যে রয়েছে—
হাওড়া–রক্সৌল
শিয়ালদহ–পাটনা
শিয়ালদহ–সীতামারি
শিয়ালদহ–গোরক্ষপুর
মালদহ টাউন–দিঘা
কলকাতা–মধুবনী
আসানসোল–পাটনা
আসানসোল–গোরক্ষপুর
অর্থাৎ শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের একাধিক প্রান্তের যাত্রীরাও এই পরিষেবার সুবিধা নিতে পারবেন। বিশেষ করে বিহার ও উত্তরপ্রদেশমুখী যাত্রীদের জন্য বাড়তি ট্রেনের সংখ্যা উৎসবের সময়ে চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সাতজোড়া অতিরিক্ত ট্রেন হাওড়া-শিয়ালদহ থেকে
পূর্ব রেলের তথ্য অনুযায়ী, হাওড়া–রক্সৌল, শিয়ালদহ–পাটনা এবং শিয়ালদহ–সীতামারি রুটে সাতজোড়া করে অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই রুটগুলিতে দুর্গাপুজো এবং পরবর্তী উৎসবের সময়ে বাড়ি ফেরার যাত্রীদের চাপ বেশি থাকে। ফলে বাড়তি ট্রেনের মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, শিয়ালদহ থেকে গোরক্ষপুর রুটেও থাকছে বিশেষ পরিষেবা। এই রুটে আপ ও ডাউন মিলিয়ে মোট ১৪টি স্পেশাল ট্রেন চালানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
ফলে উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চলের দিকে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্যও উৎসবের মরশুমে অতিরিক্ত ট্রেনের সুবিধা থাকছে।
কলকাতা-মধুবনী ও আসানসোল থেকেও বাড়তি পরিষেবা
কলকাতা থেকে মধুবনী এবং আসানসোল থেকে পাটনা ও গোরক্ষপুর রুটেও বিশেষ ট্রেন চালানো হবে। এই রুটগুলিতে সাতজোড়া করে অতিরিক্ত ট্রেন পাওয়ার কথা রয়েছে।
বিহারের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রুটগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজোর সময় যেমন বহু মানুষ কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে বিহারে যান, তেমনই উৎসব শেষে বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে কর্মসূত্রে বাংলায় ফিরে আসা যাত্রীদের সংখ্যাও বেড়ে যায়।
এই যাতায়াতের চাপ সামলাতে স্পেশাল ট্রেনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দিঘা যাওয়ার জন্যও সুখবর
শুধু উত্তর ভারতমুখী যাত্রীদের কথা মাথায় রাখা হয়নি। বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দিঘার জন্যও বাড়তি ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উৎসবের মরশুমে মালদহ টাউন থেকে দিঘার মধ্যে সাতটি অতিরিক্ত ট্রেন চলবে। ফলে উত্তরবঙ্গ ও মালদহ অঞ্চলের মানুষজনের জন্য পুজোর ছুটিতে সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার সুযোগ আরও সহজ হতে পারে।
সাধারণত পুজোর ছুটি ও সপ্তাহান্তে দিঘামুখী ট্রেনে ভিড় বাড়ে। সেই চাপ কিছুটা কমাতেই এই অতিরিক্ত পরিষেবা কার্যকর হতে পারে। মালদহ থেকে সরাসরি দিঘা যাওয়ার বাড়তি ট্রেন থাকায় মাঝপথে ট্রেন বদলের প্রয়োজনও অনেক যাত্রীর ক্ষেত্রে কমতে পারে।
কোন কোন স্টেশনে দাঁড়াবে?
শুধু শুরু ও গন্তব্য স্টেশন নয়, মাঝের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনেও এই বিশেষ ট্রেনগুলির স্টপেজ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ব রেলের তরফে জানানো হয়েছে, শিয়ালদহ ও হাওড়া থেকে ছেড়ে যাওয়া একাধিক ট্রেন বর্ধমান এবং বীরভূমের বিভিন্ন এলাকার উপর দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছবে।
ফলে কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেন না পেলেও এই রুটের অন্তর্বর্তী স্টেশনগুলির যাত্রীরা বিশেষ ট্রেনের সুবিধা নিতে পারবেন।
তবে প্রতিটি ট্রেনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কোন স্টেশনে কতক্ষণ দাঁড়াবে, সেই বিস্তারিত সূচি আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে। যাত্রার আগে যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট ট্রেনের সম্পূর্ণ সময়সূচি দেখে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ কামরা থেকে এসি—থাকছে একাধিক বিকল্প
স্পেশাল ট্রেনগুলিতে বিভিন্ন ধরনের কামরা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ শ্রেণির কামরা থেকে শুরু করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ—বিভিন্ন শ্রেণিতে যাত্রার সুযোগ মিলবে।
এর ফলে যাত্রীরা নিজেদের প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী টিকিট বেছে নিতে পারবেন। উৎসবের সময়ে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ ট্রেনগুলিতে আসন পাওয়ার সুযোগও যাত্রীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে কোন ট্রেনে কতগুলি কোচ থাকবে এবং প্রতিটি শ্রেণিতে আসন সংখ্যা কত, সেই বিস্তারিত তথ্য রেল কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হতে পারে।
কবে থেকে টিকিট বুকিং শুরু?
বিশেষ ট্রেনের ঘোষণা হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও থেকেই যাচ্ছে—কবে থেকে টিকিট বুক করা যাবে?
পূর্ব রেলের তরফে আপাতত ট্রেন চলাচলের সময়কাল ও রুটের বিষয়ে তথ্য দেওয়া হলেও বুকিং শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনও জানানো হয়নি। পরবর্তী সময়ে পৃথক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বুকিং সংক্রান্ত তথ্য জানানো হবে বলে রেল সূত্রে খবর।
তাই যাত্রীদের এখনই কোনও অনানুষ্ঠানিক তথ্যের উপর নির্ভর না করে পূর্ব রেলের পরবর্তী ঘোষণা দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বুকিং চালু হলে নির্দিষ্ট ট্রেন নম্বর, যাত্রার তারিখ, স্টপেজ এবং ভাড়ার তথ্যও জানা যাবে।
উৎসবের সময়ে রেলের উপর চাপ কমানোর বড় উদ্যোগ
পুজো থেকে ছট—দীর্ঘ উৎসবের মরশুমে রেলের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া নতুন ঘটনা নয়। নিয়মিত ট্রেনের টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া, ওয়েটিং লিস্ট বাড়া এবং স্টেশনে ভিড়—সব মিলিয়ে যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়।
এই পরিস্থিতিতে স্পেশাল ট্রেন চালানো রেলের জন্যও চাপ সামলানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। একইসঙ্গে যাত্রীদের সামনে বিকল্প তৈরি হওয়ায় নিয়মিত ট্রেনগুলির উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষ করে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের দিকে যাওয়ার রুটগুলিতে বাড়তি পরিষেবা উৎসবের সময় বড় সংখ্যক যাত্রীকে সুবিধা দিতে পারে।
পুজোর বেড়ানোর পরিকল্পনায় বাড়তি সুবিধা
উৎসবের মরশুম এখন আর শুধু পুজোর চার দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দুর্গাপুজোর পর লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, দীপাবলি এবং ছটপুজোকে ঘিরে দীর্ঘ ছুটির সুযোগ তৈরি হয়। সেই সময়েই অনেকে পরিবার নিয়ে দূরের শহরে যান বা পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন।
পূর্ব রেলের এই বিশেষ ট্রেনের তালিকায় তাই একদিকে যেমন পাটনা, রক্সৌল, সীতামারি, গোরক্ষপুর ও মধুবনীর মতো গন্তব্য রয়েছে, তেমনই রয়েছে দিঘার মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।
ফলে বাড়ি ফেরার যাত্রী এবং পর্যটক—দুই ধরনের যাত্রীই এই পরিষেবা থেকে উপকৃত হতে পারেন।
নজর এখন রেলের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে
ট্রেনের রুট এবং পরিষেবার সময়কাল ঘোষণা হলেও বুকিংয়ের দিনক্ষণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই যাত্রীদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরবর্তী রেল বিজ্ঞপ্তি।
বুকিং শুরু হওয়ার পর দ্রুত টিকিট কাটাই উৎসবের সময়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা নিশ্চিত করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গাপুজো, দীপাবলি এবং ছটপুজোর কাছাকাছি সময়ে চাহিদা দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১৫ অক্টোবর থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত পূর্ব রেলের একাধিক স্পেশাল ট্রেন উৎসবের মরশুমে যাত্রী পরিষেবায় বাড়তি স্বস্তি আনতে পারে। হাওড়া-শিয়ালদহ থেকে বিহার-উত্তরপ্রদেশ, কলকাতা থেকে মধুবনী কিংবা মালদহ থেকে দিঘা—বিভিন্ন রুটে বাড়তি ট্রেনের ফলে পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফেরা ও বেড়ানোর পরিকল্পনা আরও সহজ হতে চলেছে। এখন অপেক্ষা শুধু বুকিং শুরুর তারিখ ঘোষণার।



